সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
Logo

ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদায় জলবায়ু সংকটের শঙ্কা

নিউজ ডেস্ক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা। এতে বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। ইউরোপে ২০৩০ সালের মধ্যে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা ১৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তখন এ খাতে বার্ষিক বিদ্যুৎ ব্যবহার দাঁড়াতে পারে ২৮৭ টেরাওয়াট-ঘণ্টা, যা ২০২২ সালে স্পেনের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের চেয়েও বেশি।

এ পরিস্থিতিতে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় এআইয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জার্মানিভিত্তিক পরিবেশবাদী সংস্থা বিয়ন্ড ফসিল ফুয়েলস (বিএফএফ)। সংস্থাটির মতে, জলবায়ু সংকটের সমাধান হিসেবে এআইকে তুলে ধরার আগে এর পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণ জলবায়ু কার্যক্রম এবং বিভিন্ন খাতের বিদ্যুতায়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এআইয়ের সম্ভাব্য সুফল নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দাবি থাকলেও সেগুলোর পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই বলেও মনে করে সংস্থাটি।

এআইয়ের জলবায়ু সুফল নিয়ে প্রশ্ন

বিএফএফের তথ্য অনুযায়ী, এআইয়ের জলবায়ু সুফল নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের করা দাবির ৭৩ শতাংশের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। চলতি বছরের শুরুর দিকে কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠনের উদ্যোগে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে আসে।

গবেষণায় গুগল, মাইক্রোসফট ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার ১৭২টি বক্তব্য বিশ্লেষণ করা হয়। এসব বক্তব্যে দাবি করা হয়েছিল, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় এআই সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র ২৭ শতাংশ দাবির সঙ্গে প্রকাশিত একাডেমিক গবেষণার সূত্র যুক্ত ছিল। অন্যদিকে, ৩৭ শতাংশ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণই উল্লেখ করা হয়নি।

গবেষণায় চ্যাটজিপিটি, জেমিনি ও কোপাইলটের মতো ভোক্তাপর্যায়ের জেনারেটিভ এআই ব্যবস্থার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য ও যাচাইযোগ্য মাত্রায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর কোনো উদাহরণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে বিএফএফ। সংস্থাটির মতে, এআইয়ের সম্ভাব্য সুফল তুলে ধরার সময় প্রযুক্তিটির বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদা ও পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না।

২০৩০ সালের মধ্যে বাড়তে পারে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা

বিএফএফের গবেষণার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইউরোপে ২০৩০ সালের মধ্যে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা সর্বোচ্চ ১৬০ শতাংশ বাড়তে পারে। তখন এ খাতে বার্ষিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ২৮৭ টেরাওয়াট-ঘণ্টা। ২০২২ সালে স্পেনের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের তুলনায় এ পরিমাণ বেশি।

সংস্থাটির আশঙ্কা, নতুন ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ চাহিদা মূলত জীবাশ্ম গ্যাস দিয়ে পূরণ করা হলে জলবায়ুর ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে নতুন যুক্ত হওয়া ডেটা সেন্টারগুলোর বার্ষিক কার্বন নিঃসরণ ২০৩০ সালে ৩ কোটি ৯০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইডে পৌঁছাতে পারে। বিএফএফের হিসাব অনুযায়ী, এই পরিমাণ লিথুয়ানিয়া ও এস্তোনিয়ার ২০২২ সালের সম্মিলিত বার্ষিক নিঃসরণের চেয়েও বেশি।

বিএফএফ বলছে, ডেটা সেন্টারের বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদা নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে পূরণ করা প্রয়োজন। তবে নতুন ডেটা সেন্টারগুলো যদি অন্য খাতের জন্য পরিকল্পিত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, তাহলে পরিবহন, শিল্প ও ভবন খাতের কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

বিদ্যুতের বিল বাড়ার আশঙ্কা

ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণ বিদ্যুতের দাম এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও প্রভাব ফেলতে পারে। এ ক্ষেত্রে আয়ারল্যান্ডের উদাহরণ তুলে ধরেছে বিএফএফ।

সংস্থাটির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে আয়ারল্যান্ডের অর্থনীতি থেকে ৭১৫ মিলিয়ন ইউরো ব্যয় হয়েছে। বর্তমানে দেশটির মোট বিদ্যুতের ২২ শতাংশের বেশি ব্যবহার করে ডেটা সেন্টারগুলো।

বিএফএফের দাবি, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের জ্বালানি সংকটের সময় আয়ারল্যান্ডের দরিদ্র পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত ২০৯ ইউরো বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়েছে।

সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা সীমিত রাখা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো গেলে ২০২৫ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশটির পরিবারগুলো আনুমানিক ৪৩৫ ইউরো সাশ্রয় করতে পারে। এ সময় আরেকটি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট দেখা দিলেও এ সাশ্রয় সম্ভব হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ ব্যবহারে অগ্রাধিকার নির্ধারণের আহ্বান

বিএফএফ কপ৩১ সম্মেলনে ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট চূড়ান্ত জ্বালানি চাহিদার ৩৫ শতাংশ বিদ্যুতায়নের লক্ষ্যমাত্রাকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে সংস্থাটির মতে, বিদ্যুতায়ন জলবায়ু সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে তখনই, যখন তা নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে হবে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাবে।

সংস্থাটি মনে করে, ডেটা সেন্টারের তুলনায় পরিবহন, ভবন ও শিল্প খাতের বিদ্যুতায়নকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কারণ, ডেটা সেন্টারের বাড়তি চাহিদা বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ তৈরি করছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও পরিবহন খাতের বিদ্যুতায়ন বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ইউরোপের পাঁচটি দেশে পরিচালিত এক জনমত জরিপের তথ্যও তুলে ধরেছে বিএফএফ। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন, নতুন ডেটা সেন্টার কেবল নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পরিচালিত হলেই নির্মাণ করা উচিত। আর ৭৩ শতাংশের মত, বিভিন্ন খাতে বিদ্যুৎ কীভাবে বণ্টন করা হবে, সে বিষয়ে সরকারের স্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।

বিএফএফের সুপারিশ, নতুন এআই অবকাঠামোর জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ করতে হবে, অতিরিক্ত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রতিটি ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকটের সময় ডেটা সেন্টারের চেয়ে সাধারণ মানুষ ও গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

বিএফএফের বক্তব্য, এআইকে জলবায়ু সংকট মোকাবিলার কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হলে শুধু ইতিবাচক অঙ্গীকার যথেষ্ট নয়। ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ ব্যবহার ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ন্ত্রণে বাধ্যতামূলক নীতিমালা প্রয়োজন। অন্যথায় এআইয়ের সম্ভাব্য সুফলের আড়ালে বাড়তে পারে জ্বালানি ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন