হরমুজ প্রণালির কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইরানি দ্বীপ কেশমে আবারও সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, দেশটির সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের চেষ্টার জবাবেই এ হামলা চালানো হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথের এত কাছে নতুন করে সামরিক তৎপরতা শুরু হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগের দিন এ অভিযান পরিচালিত হয়। এক মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে সারফেস-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা ইরানি বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলাটি চালানো হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমও কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণের খবর নিশ্চিত করেছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ইরানি বাহিনী একটি মার্কিন উড়োজাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করলে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী একটি স্থাপনায় আঘাত হানে মার্কিন বাহিনী। তবে অভিযানে স্থাপনাটির কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কিংবা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথের কাছে সংঘাত
পারস্য উপসাগরে অবস্থিত কেশম ইরানের সবচেয়ে বড় দ্বীপ। হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অবস্থানের কারণে দ্বীপটি সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান নৌপথ এই প্রণালি।
ফলে কেশম দ্বীপ কিংবা আশপাশের জলসীমায় সংঘাত বাড়লে তার প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যে পড়তে পারে। জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে পরিবহন ও বিমা ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি তেল সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
সর্বশেষ হামলার খবরের পর এশিয়ার বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ দীর্ঘ সময় ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।
কেশম দ্বীপে ধারাবাহিক মার্কিন অভিযান
চলমান সংঘাতের মধ্যে কেশম দ্বীপে এটিই যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম হামলা নয়। এর আগে ২০২৬ সালের ৩১ মে দ্বীপটি ও পার্শ্ববর্তী গোরুক এলাকায় ইরানের রাডার এবং ড্রোন পরিচালনাকেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালানোর কথা জানায় মার্কিন সামরিক বাহিনী।
৫ জুন একই এলাকায় ইরানের রাডার স্থাপনায় আবারও অভিযান পরিচালনা করা হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সামুদ্রিক চলাচলের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত চারটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করার পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
১৬ জুলাই কেশম দ্বীপে নতুন করে হামলার খবর প্রকাশ করে ইরানের গণমাধ্যম। এরপর ১ আগস্টের হামলায় দ্বীপটির একটি বেসামরিক বাড়ি ধ্বংস হয়। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, ওই ঘটনায় এক দম্পতি ও তাঁদের দুই বছর বয়সী সন্তান নিহত হয়। হামলার ধরন বিশ্লেষণ করে প্রায় ৯০০ কেজি ওজনের মার্ক-৮৪ বোমা ব্যবহারের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এ ছাড়া ১ সেপ্টেম্বর ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন দেশটির বিভিন্ন স্থানে মার্কিন হামলার সময় কেশম দ্বীপেও বিস্ফোরণের খবর প্রচার করে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনায় নতুন হিসাব-নিকাশ
সর্বশেষ অভিযানকে আত্মরক্ষামূলক বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন। তবে হরমুজ প্রণালির মতো স্পর্শকাতর এলাকায় একের পর এক সামরিক অভিযান আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষ করে কোনো সামরিক উড়োজাহাজ, জাহাজ বা স্থাপনায় নতুন করে হামলা হলে পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে সংঘাত বিস্তারের ঝুঁকি রয়েছে।
এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কূটনৈতিক চাপও বাড়ছে। আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তবে ওয়াশিংটন এ বিষয়ে এখনো প্রকাশ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।
বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্যও উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ কমে যেতে পারে। এতে অপরিশোধিত তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্যও এমন পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে জ্বালানি আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলা মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এখন ইরানের প্রতিক্রিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে পরিস্থিতির গতিপথ। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও বাড়ছে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ।

