রাজনৈতিক পালাবদলের পর বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নতুন গতি পেয়েছে। বিশেষ করে সাবেক সরকারপন্থী প্রভাবশালী সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ধারাবাহিক তদন্ত দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দুদকের সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত সেনা, বিমান, গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসনের অন্তত ১০ জন সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ, বিদেশযাত্রা নিষিদ্ধ এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে আলোচনায় থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা:
-
জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ: সাবেক সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে সম্পদ অর্জন, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ।
-
এয়ার চিফ মার্শাল (অব.) শেখ আব্দুল হান্নান: সম্পদ গোপন ও বিদেশে অর্থ পাচার নিয়ে তদন্ত চলছে।
-
মেজর জেনারেল টি এম জোবায়ের (সাবেক এনএসআই ডিজি): লন্ডনে অর্থ পাচার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ।
-
মেজর জেনারেল (অব.) মো. সিদ্দিকুর রহমান (সাবেক রাজউক চেয়ারম্যান): ভূমি প্রকল্পে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার।
-
মেজর জেনারেল (অব.) সালাউদ্দিন মিয়াজী (প্রধানমন্ত্রীর সাবেক সামরিক সচিব): জমি দখল, পার্ক নির্মাণে অনিয়ম ও সম্পদ গড়ার অভিযোগে আটক।
-
মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক (সাবেক ডিজিএফআই প্রধান): দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা।
-
লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মুজিবুর রহমান (সাবেক এসএসএফ ডিজি): জব্দ হয়েছে ফ্ল্যাট, প্লট ও ব্যাংক হিসাব; বর্তমানে আত্মগোপনে।
-
লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী: মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে দুর্নীতির তদন্তাধীন।
-
মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান (সাবেক এনটিএমসি প্রধান): ৩৪২ কোটি টাকার লেনদেন ও ৪০ কোটির সম্পদ জব্দ, বর্তমানে কারাগারে।
-
মেজর জেনারেল (অব.) সাফিনুল ইসলাম (সাবেক বিজিবি ডিজি): ৫৬টি ব্যাংক হিসাব জব্দ, স্বস্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ।
দুদকের অবস্থান
দুদকের মহাপরিচালক আখতার হোসেন বলেন, “আমরা কোনো ব্যক্তির পদ-পদবির ভিত্তিতে নয়, অভিযোগের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান করছি। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ শেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জনমতের চাপ ও প্রত্যাশা
নাগরিক সমাজ ও বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে শুদ্ধি অভিযানকে ইঙ্গিত করে, তেমনি ভবিষ্যতের জন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতির বাস্তব প্রয়োগ প্রমাণ করে। তবে তারা এটিও মনে করেন যে, বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও দ্রুততা না থাকলে জনআস্থা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সারাংশ:
বাংলাদেশের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এখন আর শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ নেই। প্রভাবশালী সামরিক ও প্রশাসনিক মহলের জবাবদিহিতার আওতায় আসা দেশের শাসন ব্যবস্থায় এক নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করছে—যেখানে ক্ষমতার বাইরে গিয়েও কেউ দায়মুক্ত থাকছে না।
তথ্যসূত্র: সরকারি নথি, দুদক রিপোর্ট ও অনুসন্ধানকারী গণমাধ্যম (বিডিনিউজ২৪)

