দুদকের তদন্ত চলাকালে বিটিসিএলের বিতর্কিত প্রকল্পে সরঞ্জাম আমদানির চেষ্টা: চাপ ও প্রভাবের অভিযোগ

অপরাধ
দুদকের তদন্ত চলাকালে বিটিসিএলের বিতর্কিত প্রকল্পে সরঞ্জাম আমদানির চেষ্টা: চাপ ও প্রভাবের অভিযোগ
নিউজ ডেস্ক
২৭ জুলাই ২০২৫

সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) একটি বিলিয়ন টাকার প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও সরঞ্জাম আমদানির প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান চলাকালে এমন পদক্ষেপে নীতিগত প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

প্রকল্পটি ‘৫জি উপযোগীকরণে বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’ নামে পরিচিত। এর মোট ব্যয় ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৪৬৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে যন্ত্রপাতি কেনার জন্য।

প্রথম পর্যায়ে চীনের হুয়াওয়ে টেকনোলজিসকে ৩২৬ কোটি টাকার সরঞ্জাম সরবরাহের কাজ দেওয়া হলেও, দরপত্র মূল্যায়ন ও প্রকল্প পরিকল্পনায় ‘মারাত্মক অসঙ্গতি’ থাকার অভিযোগ ওঠে। এরপরই অনুসন্ধানে নামে দুদক। প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দরপত্রে প্রভাব খাটানো, অতিরিক্ত ক্ষমতার যন্ত্রপাতি কেনা এবং গোপন তথ্য ফাঁসের মতো অভিযোগ তদন্তাধীন।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

ক্ষমতা পরিবর্তনের পর নতুন প্রশাসনের অধীনে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আসা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব প্রকল্পটি আবার সচল করতে সক্রিয় হন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দুদক চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করে আমদানি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। যদিও দুদক জানায়, তাদের প্রাথমিক অনুসন্ধানেই আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ মিলেছে।

দরপত্র অনুযায়ী, সরঞ্জাম আমদানির আগে কারখানা পরিদর্শন বাধ্যতামূলক হলেও, সংশ্লিষ্টদের চীন সফর বাতিল হয়। পরে হুয়াওয়ে নিজেই জানায়, তারা কারখানায় পরীক্ষা করে পণ্য পাঠাবে। অথচ বিটিসিএলের কোনো দপ্তর থেকে হুয়াওয়েকে দেওয়া চিঠির বিষয়ে নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম বন্দরে যন্ত্রপাতি পৌঁছেছে কি না, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো নিশ্চিত করতে পারেনি। আমদানির নথিপত্র ব্যাংকে জমা না পড়ায় অর্থ ছাড় হয়নি বলেও জানা গেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “যে প্রকল্পের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তাধীন, সেখানে কেনাকাটা এগিয়ে নেওয়া দুর্নীতি সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হবে।” তিনি আরও বলেন, “সরঞ্জাম না কিনলে লোকসান হবে—এ যুক্তি দাঁড় করানো হলে তার পক্ষে কস্ট-বেনিফিট বিশ্লেষণ থাকা উচিত।”

সরকারি ক্রয়বিধিমালা অনুযায়ী, অনুসন্ধানাধীন প্রকল্পে যেকোনো চুক্তি বা পেমেন্ট সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে হয়। অথচ এ ক্ষেত্রে বিটিসিএলের পদক্ষেপগুলো নিয়ম ভাঙারই ইঙ্গিত দেয়।

প্রকল্পের আইনি পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান প্রথমে পক্ষে মত দিলেও, দুর্নীতির অভিযোগ জানার পর তাদের মতামত পাল্টে ফেলে। তারা উল্লেখ করে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্টের (পিপিএ ২০০৬) ধারা ৬৪ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলসের (পিপিআর ২০০৮) ১২৭ বিধান অনুসারে তদন্তাধীন প্রকল্পে কেনাকাটা আইনসম্মত নয়।

সরকারের অনুমতি ছাড়া কারখানা পরিদর্শন বাতিল করে সরাসরি জাহাজীকরণে হুয়াওয়ের তড়িঘড়ি উদ্যোগ ও প্রকল্প পরিচালকের চিঠি হুয়াওয়েতে পৌঁছে যাওয়া—দুটিই নানা প্রশ্ন তুলেছে। কীভাবে একটি দাপ্তরিক চিঠি হুয়াওয়ের হাতে পৌঁছালো, সে প্রশ্নে বিটিসিএল এখনো নিরব।

বিটিসিএলের এই প্রকল্প এখন রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আইনি বিতর্কের কেন্দ্রে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত যেকোনো অর্থছাড় বা পণ্য গ্রহণ ভবিষ্যতে সরকারকে আইনি জটিলতায় ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন নীতিনির্ধারকরা।