দিলীপ আগরওয়ালার অর্থ পাচার নিয়ে নতুন তথ্য সিআইডির হাতে
ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার আগরওয়ালার সম্পদ, ব্যবসায়িক লেনদেন ও আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তাঁর বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ, ব্যাংকঋণে অনিয়ম এবং সোনা ও হীরা কেনাবেচার আড়ালে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের পাশাপাশি ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় উত্তরায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় করা মামলাতেও তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ওই মামলায় আদালত তাঁর চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
সম্পদ ও ব্যাংকঋণ নিয়ে নানা অভিযোগ
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, রাজধানীর গুলশান ও বনানীতে দিলীপ আগরওয়ালার একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও ভবনের বিভিন্ন ফ্লোরের মালিকানার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব সম্পত্তির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩৩০ কোটি টাকা।
এর মধ্যে গুলশান-২-এর ৯০ নম্বর সড়কে শান্তা রিয়েল এস্টেটের একটি ভবনে দুটি ডুপ্লেক্সের আনুমানিক মূল্য ৪০ কোটি টাকা। গুলশান অ্যাভিনিউয়ে আকাশ রিয়েল এস্টেটের একটি ভবনে সাতটি ফ্লোরের মূল্য প্রায় ১৭০ কোটি টাকা। এ ছাড়া বনানীতে তাঁর ১৮টি অ্যাপার্টমেন্টের আনুমানিক মূল্য ১২০ কোটি টাকা বলে সূত্রের দাবি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গুলশানের ‘শান্তা দ্য রিগ্যাল’ ও ‘টাওয়ার অব আকাশ’ ভবনে তাঁর ডুপ্লেক্স ও ফ্ল্যাট রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। টাওয়ার অব আকাশের নিচতলায় ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের সাইনবোর্ডও দেখা যায়।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা আত্মসাৎ করেন দিলীপ আগরওয়ালা। ওই অর্থের একটি অংশ দিয়ে প্রায় ৪৫ কোটি টাকার বিনিময়ে বেঙ্গল গ্রুপে পরিচালকের পদ নেওয়ার তথ্যও সামনে এসেছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া এসটিএল নামের একটি বন্ডেড ওয়্যারহাউসের অংশীদারত্ব কেনা এবং মদ আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রির মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জনের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনো জানা যায়নি।
৬৭৮ কোটি টাকার সোনা-হীরার উৎস যাচাই
দিলীপ আগরওয়ালার বিরুদ্ধে সোনা ও হীরা কেনাবেচার মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগে করা মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডি। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে জানা গেছে, ২০০৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের সোনা ও হীরা সংগ্রহের উৎস এবং আর্থিক লেনদেনের নথি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তে প্রায় ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ টাকার সোনা ও হীরা সংগ্রহের হিসাব পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এসব সম্পদের অর্থের উৎস, বিক্রেতাদের পরিচয় এবং লেনদেনের বৈধতা যাচাই করছেন তদন্তকারীরা।
সিআইডি সূত্র জানায়, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের আমদানি, স্থানীয় বাজার থেকে সোনা ও হীরা সংগ্রহ, বিক্রেতাদের পরিচয় এবং অর্থ পরিশোধের হিসাব মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি দিলীপ আগরওয়ালা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা সম্পত্তির দলিল, ব্যাংকঋণের নথি এবং কোম্পানির শেয়ার মালিকানার তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে।
আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার মামলায় চার দিনের রিমান্ড
এদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট উত্তরায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিএনএস সেন্টারের পশ্চিম পাশে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের অভিযোগে করা মামলায় দিলীপ আগরওয়ালাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ওই দিন দুপুরে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে মামলার বাদী আবদুল জব্বার গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। চিকিৎসা নেওয়ার পর গত বছরের ২৭ মার্চ তিনি উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক সুমন মিয়া আদালতে করা আবেদনে জানান, ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন, অন্য আসামিদের শনাক্ত এবং ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারের জন্য দিলীপ আগরওয়ালাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
এর আগে সিআইডি তাঁকে এক দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও আলোচনা
জানা গেছে, দিলীপ আগরওয়ালা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা, তাঁর মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের সঙ্গে তাঁর উপস্থিতির ছবি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সম্পদ অর্জন, ব্যাংকঋণ, সোনা-হীরার ব্যবসা এবং অর্থ পাচারসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল বা আদালতের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি ও লেনদেন যাচাইয়ের কাজ চলছে।


