আগামী সাত দিনে আরও ২০টি ভূমিকম্প হতে পারে
গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নিচে লুকিয়ে থাকা একটি বিশাল ভূ-চ্যুতি বা ফল্ট লাইন বাংলাদেশে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প ঘটাতে পারে—২০১৬ সালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত এক গবেষণায় এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছিল। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো সেই আশঙ্কা নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী এক সপ্তাহে দেশে আরও বহুবার ভূকম্পন হতে পারে।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী জানিয়েছেন, গত দুই দিনে চারবার ভূমিকম্প হওয়া বড় ধরনের সতর্ক সংকেত। তাঁর মতে, “আগামী সাত দিনে আরও ২০টি ভূমিকম্প হতে পারে এবং কম্পনের মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তেও পারে। এখনই সবকিছু নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে ৫.৭ মাত্রার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে বড় ধরনের দুর্যোগ দেখা দিতে পারে।”
তিনি আরও জানান, সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলোর প্রকৃত উৎপত্তিস্থল নরসিংদি অঞ্চলের ঘোড়াশাল এলাকাতেই অবস্থিত।
বাংলাদেশের অবস্থান ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা—এই তিনটি বৃহৎ টেকটোনিক প্লেটের মিলনস্থলে। প্লেটগুলো বর্তমানে দীর্ঘ সময়ের আটকে থাকা অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। ফলে দেশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে বলে মত গবেষকদের।
জাপান-প্রশিক্ষিত ভূমিকম্প গবেষক রুবাইয়াত কবির বলেন, “ভারতীয় প্লেট উত্তর-পূর্ব দিকে সরতে থাকায় ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষ বাড়ছে। এ অবস্থান বাংলাদেশের জন্য ভূমিকম্প ঝুঁকিকে আরও তীব্র করে তুলেছে।”
ঘোড়াশালের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্ট মাটির ফাটল পরীক্ষা করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাত সদস্যের একটি দল现场 পরিদর্শন করে। তারা নমুনা সংগ্রহ করেছে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা, ডেইরি ফার্ম ও পলাশ রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ এলাকা থেকে। পরীক্ষার মাধ্যমে ভূমিকম্পের গভীরতা ও প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে দলটি।
ঢাবির ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার জানিয়েছেন, বাংলাদেশে অসংখ্য ফল্ট থাকলেও সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো সিলেট-টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত সাবডাকশন জোন। এ অঞ্চলে ৮০০–১০০০ বছর ধরে জমে থাকা শক্তি এখনো মুক্ত হয়নি। তাঁর ভাষায়, “এ অঞ্চলে ভবিষ্যতে বড় ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। এটি বহুদিন ধরেই আমরা সতর্ক করছি।”
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় উল্লেখিত অতি-গোপন মেগাথার্স্ট ফল্ট পললস্তরের নিচে গভীরভাবে চাপা পড়ে রয়েছে। এখানেই দুটি প্লেটের চাপাচাপির ফলে ভয়াবহ শক্তি জমা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ১৭৬২ সালে ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে সেন্টমার্টিন দ্বীপ তিন মিটার ওপরে উঠে এসেছিল। সেই ভূমিকম্পে সুনামি হয়ে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়। তাদের মতে, কক্সবাজার-মিয়ানমার রুটে নতুন করে শক্তি সঞ্চয় শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, হিমালয়ের নিচে থাকা টেকটোনিক প্লেট ধীরে সরছে। ঠিক পরদিনই বাংলাদেশে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তিন প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং আরও গবেষণা অপরিহার্য।


