বৈশ্বিক চাপের মধ্যেও ঘুরে দাঁড়াল রূপালী ব্যাংক, খেলাপি ঋণ আদায়ে রেকর্ড

বৈশ্বিক চাপের মধ্যেও ঘুরে দাঁড়াল রূপালী ব্যাংক, খেলাপি ঋণ আদায়ে রেকর্ড
নিউজ ডেস্ক
২৫ জানুয়ারি ২০২৬

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ডলার সংকট ও খেলাপি ঋণের চাপে দেশের ব্যাংকিং খাত যখন টালমাটাল, তখন রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক ব্যতিক্রমী সাফল্যের নজির স্থাপন করেছে। কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ২০২৫ সালে খেলাপি ঋণ আদায়, আমানত সংগ্রহ এবং রেমিট্যান্স আহরণ—সব ক্ষেত্রেই ব্যাংকটি নিজেদের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছে।

ব্যাংক সূত্র জানায়, ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণের পর খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। এরই ফল হিসেবে ২০২৫ সালে রূপালী ব্যাংক খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণ থেকে নগদ আদায় করেছে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, যা রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি গ্রাহকের কাছ থেকে ৩৬১ কোটি টাকা নগদ আদায়ের পাশাপাশি সমন্বয়ের মাধ্যমে আদায় করা হয়েছে আরও ১ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণ থেকে ব্যাংকটির মোট আদায় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকায়—যা রূপালী ব্যাংকের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও গতি আনতে মামলাভিত্তিক কার্যক্রম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হয়েছে। প্রধান কার্যালয় থেকে বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে তদারকির ফলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮২৩টি মামলা নিষ্পত্তি সম্ভব হয়েছে, যেখানে আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৫৭১। দ্রুত আইনি সিদ্ধান্ত নিশ্চিতে একজন চিফ লিগ্যাল অ্যাডভাইজারও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এই উদ্যোগগুলোর প্রভাবে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য হ্রাস এসেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শ্রেণিকৃত ঋণ কমেছে ১ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা। ফলে মোট শ্রেণিকৃত ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৬৪১ কোটি টাকায় এবং খেলাপি ঋণের হার ৪২ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ৩৮ শতাংশে। একই সঙ্গে কমেছে প্রভিশন ঘাটতিও।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, বছরের এক পর্যায়ে শ্রেণিকৃত ঋণ প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছালেও কঠোর তদারকি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বছর শেষে তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।

খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদনমুখী খাত ও এসএমই ঋণে সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে রূপালী ব্যাংক। ২০২৫ সালে এসএমই খাতে নতুন করে ১ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যা ব্যাংকের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। একই বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রথমবারের মতো নিজস্ব প্রযুক্তিতে পরিচালিত মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ‘রূপালী ক্যাশ’ চালু করা হয়। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা জোরদারে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে চিফ ইনফরমেশন টেকনোলজি অফিসার।

আমানত সংগ্রহেও ব্যাংকটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ২০২৫ সালে নতুন করে ৮ লাখ ৪৯ হাজারের বেশি হিসাব খোলা হয় এবং আমানত বৃদ্ধি পায় প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পর্ষদের দিকনির্দেশনায় পরিচালিত ১০০ দিনের বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নতুন আমানত এবং খোলা হয়েছে প্রায় ৪ লাখ নতুন হিসাব।

রেমিট্যান্স আহরণেও রেকর্ড করেছে রূপালী ব্যাংক। ২০২৫ সালে ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে এসেছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক রেমিট্যান্স। একই সঙ্গে ব্যাংকের রেগুলেটরি ক্যাপিটাল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, “আমরা কেবল স্বল্পমেয়াদি অর্জনে সীমাবদ্ধ থাকতে চাই না। লক্ষ্য হলো রূপালী ব্যাংককে একটি টেকসই, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির এই ধারা অব্যাহত থাকবে।”

বিশ্লেষকদের মতে, সময়োপযোগী নেতৃত্ব ও ডিজিটাল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে রূপালী ব্যাংক আবারও গ্রাহক আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসছে। এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক খাতে এটি একটি অনুকরণীয় মডেল হয়ে উঠতে পারে।