বরফ গলছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে

জাতীয়
বরফ গলছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে
নিউজ ডেস্ক
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

দীর্ঘ প্রায় দেড় বছরের অস্বস্তিকর দূরত্বের পর আবারও কূটনৈতিক সক্রিয়তায় গতি ফিরছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে। সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, স্থবিরতার সময়টিকে অনেকেই ‘জমে থাকা বরফ’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন—যা এখন ধীরে ও নিয়ন্ত্রিতভাবে গলতে শুরু করেছে।

গত বছরের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তীব্র হয়। দিল্লির অবস্থান এবং ঢাকার অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া—দুই মিলিয়ে সীমান্তে সহিংসতা, তিস্তা চুক্তির অগ্রগতি না হওয়া, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা ও ভিসা জটিলতা জনমনে অসন্তোষ বাড়ায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ভারত আগেই জানিয়েছিল তারা নির্বাচিত সরকারের সঙ্গেই সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে বলেই তাঁর ধারণা।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হবে সমমর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি আবেগ নয়—বাস্তববাদী কূটনৈতিক অবস্থানের ইঙ্গিত।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির মনে করেন, ভিসা ও রেল যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা ইতিবাচক লক্ষণ হলেও সীমান্তে পুশ-ইন, হত্যাকাণ্ড ও পানিবণ্টনের মতো ইস্যুতে অগ্রগতি না হলে স্থায়ী উন্নতি সম্ভব নয়।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে সবচেয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি এসেছে ভিসা পরিষেবায়। নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে গত বছর দুই দেশই ভিসা কার্যক্রম কঠোরভাবে সীমিত করেছিল।

এখন নতুন করে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে ভারতীয়দের ভিসা দেওয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সিলেটে ভারতীয় মিশন জানিয়েছে, ধাপে ধাপে পূর্ণমাত্রায় ভিসা পরিষেবা চালু করা হবে। আপাতত মেডিকেল ও ডাবল-এন্ট্রি ভিসা দেওয়া হচ্ছে; পর্যটনসহ অন্যান্য ভিসাও শিগগির চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্র বলছে, এটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তার অংশ।

ঢাকায় নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা উপস্থিত ছিলেন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শুভেচ্ছাবার্তা পৌঁছে দেন।

দিল্লিতে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারত একটি গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশকে সমর্থন করে এবং ঐতিহাসিক সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী।

বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর-ও বলেছেন, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতিতে বাধা হবে না। তাঁর মতে, সম্পর্ক কোনো একক ইস্যুতে আটকে থাকবে না।

সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, দুই দেশের রেল যোগাযোগ পুনরায় চালুর বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

রেল চলাচল স্বাভাবিক হলে বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পর্যটনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এটিকে রাজনৈতিক আস্থার বাস্তব পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এক অনুষ্ঠানে রাজশাহীতে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার মনোজ কুমার বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কৃত্রিম নয়; ভাষা ও সংস্কৃতির যৌথ ঐতিহ্য দুই দেশের জনগণকে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত করেছে।

কূটনৈতিক মহলের ভাষ্য—ভিসা সহজীকরণ, রাজনৈতিক বার্তা, সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততা ও যোগাযোগ পুনর্বিবেচনা—সব মিলিয়ে দুই দেশ সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের পথে এগোচ্ছে। তবে এটি দ্রুত নয়, বরং হিসেবি ও ধাপে ধাপে এগোনো প্রক্রিয়া।

বিশ্লেষকদের মতে, সম্পর্ক টেকসই করতে হলে দলনির্ভরতার বাইরে গিয়ে জনগণভিত্তিক আস্থা গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে সাময়িক উষ্ণতা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতায় রূপ নাও নিতে পারে। আপাতত কূটনৈতিক অঙ্গনে আশাবাদী সুর থাকলেও সেটি সতর্ক আশাবাদ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।