৪৫ বছর পলাতক মেজর মোজাফফরকে যেভাবে গ্রেপ্তার করা হলো
৪৫ বছর পলাতক থাকার পর ধরা পড়লেন জিয়া হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত মোজাফফর, মেয়ের সূত্র আর জন্মদাগেই মিলল পরিচয়
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত এবং দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা সাবেক মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেনকে অবশেষে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিজের পরিচয় গোপন করতে ছদ্মনাম, ভুয়া নথি ও পরিচয় বদলের নানা কৌশল অবলম্বন করলেও শেষ পর্যন্ত মেয়ের কর্মস্থলের সূত্র এবং নাকের নিচে থাকা একটি জন্মদাগই তাকে শনাক্ত করতে সহায়তা করে।
গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সূত্রে জানা যায়, মোজাফফরের মেয়ের একটি বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠানে চাকরির তথ্য থেকেই তদন্তের অগ্রগতি শুরু হয়। কয়েক মাস ধরে মেয়ের চলাফেরা ও কর্মস্থল পর্যবেক্ষণের পর রাজধানীর বনানী ডিওএইচএসের একটি বাসা চিহ্নিত করেন গোয়েন্দারা। পরে ওই বাসাটি গোপনে নজরদারিতে রাখা হয়।
তদন্তকারীরা জানান, মোজাফফরের পুরোনো শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে নাকের ঠিক নিচে থাকা একটি কালো দাগ বা জন্মচিহ্নকে শনাক্তকরণের প্রধান সূত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বুধবার (১৫ জুলাই) গভীর রাতে সাধারণ পোশাকে ডিবির একটি দল বাসাটিতে যায় এবং নিজেদের তার মেয়ের অফিসের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেয়।
দরজা খোলার পর এক বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি তাদের সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে এলে কর্মকর্তারা তার মুখমণ্ডল পর্যবেক্ষণ করে জন্মদাগটি শনাক্ত করেন। পরিচয় নিশ্চিত করতে তারা জানতে চান তিনি কে। জবাবে ওই ব্যক্তি নিজেকে ‘মোজাফফর, মেয়ের বাবা’ বলে পরিচয় দেন। এরপরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থান ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে মোজাফফর হোসেন অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার রাতে তিনি ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিনের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কক্ষে প্রবেশ করেন এবং জিয়াউর রহমানকে বাইরে এনে গুলি করেন।
হত্যাকাণ্ডের পর তিনি তৎকালীন ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে ফোন করে ইংরেজিতে জানান, ‘The President has been killed’।
পরদিন সরকারি বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর এবং মেজর জেনারেল মঞ্জুর নিহত হলে মোজাফফর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। পরে সামরিক আদালতে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলেও তিনি ভারতে আত্মগোপন করেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সেখানে তিনি নতুন পরিচয়ে বসবাস করেন এবং ভুয়া নাগরিকত্ব ও জাল নথির মাধ্যমে পাসপোর্ট তৈরি করে বিভিন্ন দেশেও ভ্রমণ করেন। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তার অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে জীবনের শেষভাগে তিনি গোপনে বাংলাদেশে ফিরে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকায় বসবাস শুরু করেন। নিজেকে রাজনীতিবিমুখ অবসরপ্রাপ্ত একজন সাধারণ বৃদ্ধ হিসেবে পরিচিত করায় স্থানীয়দের মধ্যেও তার প্রকৃত পরিচয় নিয়ে কোনো সন্দেহ তৈরি হয়নি।
গ্রেপ্তারের পর ডিএমপি ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, মোজাফফর হোসেন একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং কোর্ট মার্শালে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে তাদের বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় হস্তান্তর করা হয়েছে।


