ঝুঁকিপূর্ণ সাগরপথে ইতালি-গ্রিসমুখী বাংলাদেশির সংখ্যা শীর্ষে
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অনিয়মিত পথে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টায় গত বছরের মতো এবারও শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। ইতালিতে প্রবেশের পাশাপাশি ২০২৬ সালে সাগরপথে গ্রীসে পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশি নাগরিকদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যা নতুন রেকর্ড হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্যের বরাত দিয়ে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সাগরপথে ইতালিতে পৌঁছেছেন আরও ৪ হাজার ২৪৯ জন। একই সময়ে লিবিয়া থেকে গ্রীসে প্রবেশ করেছেন ৩ হাজার ৬০৮ জন বাংলাদেশি।
তবে ইউরোপে যাওয়ার এই পথ প্রতিনিয়ত পরিণত হচ্ছে মৃত্যুঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায়। চলতি বছরের মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রীসে যাওয়ার পথে অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে ১২ জন ছিলেন সুনামগঞ্জের বাসিন্দা।
গত ২১ মার্চ লিবিয়ার তোবরুক থেকে যাত্রা শুরু করা একটি নৌকা দিক হারিয়ে ছয় দিন ভূমধ্যসাগরে ভেসে ছিল। খাদ্য ও পানির সংকটে যাত্রীদের কয়েকজনের মৃত্যু হলে পাচারকারীদের নির্দেশে তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
এরপরও ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় লিবিয়ামুখী মানুষের স্রোত থামছে না। সাগরপথে ইতালি বা গ্রীসে যাওয়ার অপেক্ষায় লিবিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে আটকা পড়ে বহু বাংলাদেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অনেককে জিম্মি করে তাদের পরিবারের কাছ থেকে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, অনিয়মিত পথে ইউরোপে যাওয়া বাংলাদেশিদের অধিকাংশের বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ অন্তত ১০ থেকে ১২টি জেলার মানুষ এ পথে ইউরোপে যেতে বেশি আগ্রহী।
মানবপাচারের কাজে এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারও বাড়ছে। বিশেষ করে ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে ইউরোপে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা দেশে ফিরে মামলা করলেও পাচারচক্রের মূল হোতাদের অনেকেই এখনো আইনের আওতার বাইরে রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মানবপাচারবিষয়ক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে ১ হাজার ১২৬টি নতুন মামলা হয়েছে। পুরোনো মামলাসহ ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা বিচারাধীন বা তদন্তাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩০৬টি মামলা আদালতে বিচারাধীন এবং ১ হাজার ৯৭৮টি মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
অনিয়মিত অভিবাসন ও মানবপাচারের পাশাপাশি নতুন উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে সাইবার স্ক্যাম। বিদেশে চাকরির প্রলোভনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নেওয়া অনেক বাংলাদেশি পরে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে চাকরির আশ্বাসে নেওয়া ব্যক্তিদের ৯৮ শতাংশই প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। বরং তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে প্রায় ৯০ শতাংশকে বিভিন্ন ধরনের অনলাইন প্রতারণা ও জালিয়াতিমূলক কাজে বাধ্য করা হয়েছে। এতে রাজি না হলে অনেককে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) পালিত হবে আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস। ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৩০ জুলাইকে আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এ বছরের প্রতিপাদ্য— ‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’।


