হরমুজ সংকটে তেলের বাজারে বড় ধাক্কার শঙ্কা
ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে বিশ্ববাজারে তেল ও জ্বালানির দাম নতুন করে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জ্বালানি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে স্থিতিশীল থাকলেও সরবরাহব্যবস্থায় চাপ বাড়লে সেই ভারসাম্য দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ না হলে আন্তর্জাতিক তেলবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। সংঘাত দীর্ঘ হলে এর প্রভাব শুধু অপরিশোধিত তেলের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৈশ্বিক অর্থনীতি, পরিবহন ও শিল্প খাতেও চাপ বাড়তে পারে।
রোববার সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর হরমুজ প্রণালিতে আবারও জাহাজ চলাচল ব্যাহত হতে শুরু করেছে। এতে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক তেলবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
যুদ্ধবিরতির সময় কয়েক সপ্তাহের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হয়েছিল। ওই সময়ে প্রণালিতে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে যায়। ফলে তাৎক্ষণিক সরবরাহ সংকট অনেকটাই কমে আসে এবং তেলের দামে বড় ধরনের ধাক্কা এড়ানো সম্ভব হয়।
এ ছাড়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক চীন সংঘাত শুরুর আগেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল মজুত করেছিল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অতিরিক্ত তেল কেনার চাপ এখনো বড় আকার ধারণ করেনি।
তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বর্তমান ভারসাম্য দ্রুত নষ্ট হতে পারে। তখন অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি ডিজেল, জেট ফুয়েলসহ বিভিন্ন পরিশোধিত জ্বালানির দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, চাপ বাড়ছে পরিশোধিত জ্বালানিতেও
বর্তমান সংকটে অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব স্থাপনা পুরোপুরি চালু হতে কয়েক সপ্তাহ থেকে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
অন্যদিকে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার বেশ কয়েকটি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির ডিজেল রপ্তানি কমে গেছে। যুদ্ধের আগে বিশ্ব ডিজেল রপ্তানিতে রাশিয়ার বড় অংশ ছিল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের সরবরাহে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চীনেও পরিবেশগত নীতি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনার কারণে শোধন কার্যক্রমে কিছু সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এতে ডিজেল ও জেট ফুয়েলসহ বিভিন্ন জ্বালানির বৈশ্বিক সরবরাহ আরও সংকুচিত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলো উচ্চ সক্ষমতায় পরিচালিত হলেও তীব্র গরম আবহাওয়া উৎপাদন কার্যক্রমে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
উৎপাদনে শীর্ষে থেকেও কেন যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরশীল
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল উৎপাদক এবং দেশটির অপরিশোধিত তেল উৎপাদন দৈনিক চাহিদার চেয়েও বেশি। তবে এই সক্ষমতা বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট পুরোপুরি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়।
কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তেলের বড় অংশ তুলনামূলক হালকা ধরনের, যা মূলত পেট্রোল উৎপাদনে উপযোগী। অন্যদিকে ডিজেল, জেট ফুয়েল ও ভারী শিল্পে ব্যবহৃত জ্বালানি তৈরিতে মধ্যপ্রাচ্যের ভারী অপরিশোধিত তেলের প্রয়োজন হয়।
ফলে নিজস্ব উৎপাদন বেশি হলেও জ্বালানি বাজারে যুক্তরাষ্ট্র এখনো আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
বিকল্প নৌপথও ঝুঁকির মুখে
বিশ্লেষকদের মতে, এবার পরিস্থিতি আগের চেয়ে বেশি জটিল। হরমুজ প্রণালিতে বর্তমানে আগের মতো বিপুল পরিমাণ তেল আটকে নেই। ফলে প্রণালি খুলে গেলেও বাজারে দ্রুত বড় সরবরাহ আসার সম্ভাবনা কম।
এদিকে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। হরমুজের বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব পাইপলাইনের মাধ্যমে পশ্চিমাঞ্চলে তেল সরবরাহ করে লোহিত সাগর ব্যবহার করছিল। তবে এই পথও এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা গেলে বৈশ্বিক তেলবাজারে বড় ধরনের ধাক্কা এড়ানো সম্ভব হতে পারে। তবে সংঘাত দীর্ঘ হলে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি দ্রুত আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র : সিএনএ


