স্তন ক্যানসার নিয়ে প্রচলিত ৮ ভুল ধারণা
ডিজিটাল যুগে স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য সহজে পাওয়া গেলেও সব তথ্য নির্ভরযোগ্য নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য অনেক সময় অযথা ভয় ও উদ্বেগ তৈরি করে। স্তন ক্যানসার নিয়ে এমন কিছু প্রচলিত ধারণা রয়েছে, যেগুলোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ড. ক্রিস্টিন লাই স্তন ক্যানসার নিয়ে প্রচলিত কয়েকটি ভুল ধারণার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, ভয় নয়; নির্ভরযোগ্য ও বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যই ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে সবচেয়ে কার্যকর।
চলুন জেনে নেওয়া যাক স্তন ক্যানসার নিয়ে প্রচলিত ৮টি ভুল ধারণা এবং এ বিষয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অবস্থান।
১. ব্রা পরলে কি স্তন ক্যানসার হয়?
দীর্ঘ সময় ব্রা পরা, আন্ডারওয়্যারযুক্ত ব্রা ব্যবহার করা কিংবা ব্রা পরে ঘুমালে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে—এমন ধারণা অনেকের মধ্যে রয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
ব্রা ব্যবহারের সঙ্গে স্তন ক্যানসারের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। তাই শুধু ক্যানসারের ভয়ে ব্রা ব্যবহার নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।
২. কফি পান কি স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়?
কফি বা ক্যাফেইন গ্রহণ করলে স্তনে ব্যথা, অস্বস্তি বা পরিবর্তন দেখা দিতে পারে—এমন ধারণাও প্রচলিত। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ক্যাফেইন গ্রহণের সঙ্গে স্তনের অস্বস্তির সম্পর্ক থাকতে পারে, তবে কফি পানকে স্তন ক্যানসারের কারণ হিসেবে প্রমাণ করা হয়নি।
তবে কারও নির্দিষ্ট কোনো উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৩. চিনি কি ক্যানসার কোষের খাবার?
‘চিনি খেলেই ক্যানসার বাড়ে’—এমন বক্তব্য প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়। বাস্তবে শরীরের সব কোষই শক্তির জন্য গ্লুকোজ ব্যবহার করে। শুধু চিনি সম্পূর্ণ বাদ দিলেই ক্যানসার কোষ ধ্বংস হয়ে যাবে—এমন কোনো প্রমাণ নেই।
তবে অতিরিক্ত চিনি খেলে ওজন বৃদ্ধি ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই পরিমিত খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
৪. সয়াবিন কি স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়?
সয়া, টফু বা সয়া দুধে থাকা আইসোফ্ল্যাভোনকে অনেকেই স্তন ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করেন। তবে সাধারণ খাদ্য হিসেবে পরিমিত সয়া গ্রহণকে স্তন ক্যানসারের কারণ হিসেবে প্রমাণ করা হয়নি।
সয়া নিয়ে ব্যক্তিভেদে চিকিৎসকের পরামর্শ ভিন্ন হতে পারে। বিশেষ করে যাদের আগে স্তন ক্যানসার হয়েছে বা যারা চিকিৎসাধীন, তাদের খাদ্যতালিকা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
৫. স্তনের আকার বড় হলে কি ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি?
স্তনের আকারের সঙ্গে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকির সরাসরি সম্পর্ক নেই। ছোট বা বড় স্তন—কোনোটিই একা ক্যানসারের ঝুঁকি নির্ধারণ করে না।
বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, জেনেটিক কারণ, হরমোনজনিত বিষয় এবং জীবনযাপনসহ বিভিন্ন উপাদান ক্যানসারের ঝুঁকিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
৬. স্তনে আঘাত লাগলে কি ক্যানসার হয়?
পড়ে যাওয়া, খেলাধুলা, দুর্ঘটনা বা সিটবেল্টের চাপের কারণে স্তনে আঘাত লাগলে অনেকেই ক্যানসারের আশঙ্কা করেন। তবে সাধারণ আঘাত থেকে স্তন ক্যানসার হয়—এমন প্রমাণ নেই।
আঘাতের পর ফোলা, ব্যথা বা পিণ্ডের মতো অনুভূতি দেখা দিতে পারে। তবে কোনো পরিবর্তন দীর্ঘদিন থাকলে বা নতুন পিণ্ড দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৭. গর্ভপাত বা মিসক্যারেজ কি স্তন ক্যানসারের কারণ?
গর্ভপাত বা গর্ভস্রাবের কারণে স্তন ক্যানসার হয়—এমন ধারণার পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ ধরনের ভুল তথ্য অনেক নারীর মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ভয় ও মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
৮. আইভিএফ চিকিৎসায় কি স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে?
আইভিএফ চিকিৎসায় হরমোন ব্যবহার করা হয় বলে অনেকের মধ্যে ক্যানসারের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তবে আইভিএফ চিকিৎসার কারণে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে—এমন সুস্পষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
তবে ব্যক্তির বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
সচেতনতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
স্তনে নতুন পিণ্ড, ত্বকের অস্বাভাবিক পরিবর্তন, স্তনবৃন্ত থেকে অস্বাভাবিক নিঃসরণ, আকৃতির পরিবর্তন বা দীর্ঘদিনের ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা করা উচিত নয়।
স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অযাচাইকৃত পোস্টের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসক ও নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যসূত্রের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্ক্রিনিং স্তন ক্যানসার দ্রুত শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মনে রাখবেন, ভুল তথ্য ভয় বাড়ায়; সঠিক তথ্য সচেতনতা তৈরি করে।
তথ্যসূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস


