সাপের কামড়ের চিকিৎসায় নতুন অ্যান্টিভেনম, হতে পারে যুগান্তকারী
বিষধর সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় দীর্ঘদিন ধরে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কারণ, সাপের প্রজাতিভেদে বিষের উপাদান ও শরীরে এর প্রভাব ভিন্ন। ফলে একটি অ্যান্টিভেনম দিয়ে সব ধরনের সাপের বিষ মোকাবিলা করা কঠিন। এবার এ সমস্যার সমাধানে নতুন সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন ভারত ও ডেনমার্কের একদল বিজ্ঞানী।
গবেষকেরা এমন একটি অ্যান্টিভেনম তৈরি করেছেন, যা ভারতের বিভিন্ন প্রজাতির কোবরার বিষের বিরুদ্ধে কার্যকর বলে পরীক্ষায় দেখা গেছে। বিজ্ঞানীদের আশা, পদ্ধতিটি আরও উন্নত করে মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহার করা সম্ভব হলে বিশ্বজুড়ে সাপের কামড়ে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যেতে পারে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী ‘সায়েন্স ট্রান্সলেশনাল মেডিসিন’-এ এ গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়। গবেষণায় বলা হয়েছে, নতুন অ্যান্টিভেনমটি পাঁচ ধরনের ক্ষুদ্র অ্যান্টিবডি খণ্ড বা ন্যানোবডির সমন্বয়ে তৈরি।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, চশমা কোবরা, মনোকলড কোবরা এবং ভারতের দুই প্রজাতির কিং কোবরার বিষের বিরুদ্ধে এই অ্যান্টিবডি ককটেল কার্যকর। বিষের ক্ষতিকর উপাদান শরীরের গুরুত্বপূর্ণ কোষ ও টিস্যুতে পৌঁছাতে বাধা দেওয়ার মাধ্যমে এটি কাজ করে।
ভারতে প্রতিবছর সাপের কামড়ে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় বলে ধারণা করা হয়। দেশটিতে সাপের কামড়জনিত মৃত্যুর হার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। বিষের ধরন অনুযায়ী এর প্রভাবও আলাদা। কোনো সাপের বিষ সরাসরি স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করে, আবার কোনো বিষ রক্ত ও শরীরের বিভিন্ন টিস্যুতে মারাত্মক ক্ষতি করে।
এ কারণে সব প্রজাতির সাপের বিষের বিরুদ্ধে সমান কার্যকর অ্যান্টিভেনম তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনমের কার্যকারিতায়ও বিভিন্ন ধরনের পার্থক্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে এবং নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতির বিষের বিরুদ্ধে এর কার্যকারিতা সীমিত।
প্রচলিত পদ্ধতিতে অ্যান্টিভেনম তৈরির জন্য ঘোড়ার মতো প্রাণীর শরীরে বারবার অল্প পরিমাণে সাপের বিষ প্রয়োগ করা হয়। এতে প্রাণীর শরীরে বিষের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। পরে রক্ত থেকে সেই অ্যান্টিবডি সংগ্রহ করে অ্যান্টিভেনম প্রস্তুত করা হয়। তবে এ পদ্ধতিতে উৎপাদন ব্যয় বেশি এবং প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডির পরিমাণও তুলনামূলক কম পাওয়া যায়।
নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। বিভিন্ন প্রজাতির কোবরার বিষ লামা ও আলপাকার মতো উটজাতীয় প্রাণীর শরীরে প্রয়োগ করে তাদের রক্তে তৈরি অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করেন তারা। এরপর কোন অ্যান্টিবডি বিষের ক্ষতিকর উপাদান নিষ্ক্রিয় করতে পারে, তা শনাক্ত করা হয়।
পরবর্তীতে শনাক্ত করা অ্যান্টিবডিগুলো পরীক্ষাগারে অণুজীবের মাধ্যমে উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই করেন গবেষকেরা। এ প্রক্রিয়ায় পাওয়া অ্যান্টিবডির মধ্য থেকে পাঁচটি ন্যানোবডি বেছে নিয়ে তৈরি করা হয় বিশেষ একটি অ্যান্টিবডি ককটেল।
পরীক্ষায় এই ককটেল কোবরার বিষের প্রাণঘাতী প্রভাব ঠেকাতে সক্ষম হয়েছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বিষ প্রয়োগের ৩০ মিনিট পর অ্যান্টিবডি প্রয়োগ করেও ইঁদুরকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, বিষক্রিয়ায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়া কিংবা স্নায়ুতন্ত্রে বিষের প্রভাব দেখা দেওয়া কিছু ইঁদুরও পরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। তাদের শরীরে বিষক্রিয়ার দৃশ্যমান কোনো উপসর্গও পাওয়া যায়নি।
গবেষণার অন্যতম লেখক কার্তিক সুনাগর বলেন, অ্যান্টিভেনম চিকিৎসায় প্রায় ১০০ বছর ধরে বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। নতুন এই পদ্ধতি ভারতের সাপের কামড়জনিত সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
গবেষণার আরেক লেখক ও ডেনমার্কের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী আন্দ্রেয়াস লাউটসেন বলেন, এই গবেষণা নতুন প্রজন্মের অ্যান্টিভেনম তৈরির একটি সম্ভাবনাময় পথ দেখিয়েছে।
তার মতে, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যেসব স্থানীয় সাপের বিষ মানুষের শরীরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে, সেসব বিষের নির্দিষ্ট উপাদানকে লক্ষ্য করে আলাদা অ্যান্টিভেনম তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
গবেষকেরা আরও মনে করছেন, নতুন অ্যান্টিবডি ককটেলে অতিরিক্ত উপাদান যুক্ত করে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষধর সাপের বিরুদ্ধেও এর কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব। তবে মানুষের চিকিৎসায় এটি ব্যবহারের আগে আরও বিস্তৃত পরীক্ষা ও গবেষণা প্রয়োজন।


