সর্বাত্মক যুদ্ধে নামছে সৌদি, প্রস্তুত এক লাখ সেনা

সর্বাত্মক যুদ্ধে নামছে সৌদি, প্রস্তুত এক লাখ সেনা
৩ অক্টোবর ২০২৬

ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ইয়েমেনে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার ও নৌ চলাচল নিরাপদ রাখতে দুটি সম্ভাব্য সামরিক পরিকল্পনা বিবেচনা করছে রিয়াদ।

আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বরাতে শুক্রবার (২ অক্টোবর) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। সূত্রগুলো বলছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শুরু হতে পারে।

ছয়জন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কূটনীতিকের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের তত্ত্বাবধানে থাকা ইয়েমেনি বাহিনী সম্ভাব্য স্থল অভিযান পরিচালনা করবে এবং তাদের বিমান হামলার মাধ্যমে সহায়তা দেবে রিয়াদ। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে সৌদি অভিযানে গোয়েন্দা ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সৌদির মিত্ররা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবে না বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

দুটি পরিকল্পনা বিবেচনায়

সৌদি আরবের বিবেচনায় থাকা প্রথম পরিকল্পনাটি হলো বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে ঘিরে সীমিত পরিসরের সামরিক অভিযান। দ্বিতীয় পরিকল্পনাটি আরও বিস্তৃত। এতে আল-বায়দা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফসহ ইয়েমেনের একাধিক ফ্রন্টে একযোগে অভিযান চালানোর কথা রয়েছে।

অভিযানের পরিসরের ওপর নির্ভর করে এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনা মোতায়েন করা হতে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে অভিযান শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঠিক হয়নি। সূত্রগুলোর ধারণা, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেও অভিযান শুরু হতে পারে, আবার নভেম্বরের যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরও তা শুরু হতে পারে।

সৌদি আরবের পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো এবং বাব আল-মান্দেবের আশপাশের উপকূলীয় এলাকা পুনর্দখল করা। সাম্প্রতিক সময়ে হুতিরা লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় অগ্রসর হয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের ওপর প্রভাব বাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

কেন গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব

বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশপথ। এ পথ দিয়ে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়। বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে সংঘাতের কারণে নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বাব আল-মান্দেবের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিরা বাব আল-মান্দেবের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলে সৌদি আরব নতুন করে শান্তি আলোচনায় যেতে অনাগ্রহী হতে পারে বলে কয়েকজন পশ্চিমা ও উপসাগরীয় কর্মকর্তা মনে করছেন।

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি মনে করেন, ২০১৫ সালের সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানের তুলনায় নতুন অভিযান তুলনামূলক ছোট পরিসরের হতে পারে। তার মতে, সৌদি আরবের লক্ষ্য হুতিদের পুরোপুরি পরাজিত করার চেয়ে বাব আল-মান্দেবের উপকূলীয় এলাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণ সরিয়ে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ মিত্রদের সহায়তা

সৌদি আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন ইয়েমেনে সম্ভাব্য সৌদি অভিযানে গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করছে বলে পশ্চিমা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে সরাসরি বিমান হামলায় যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

এদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করেছে তুরস্ক ও পাকিস্তান। পাকিস্তান সৌদি আরবে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন, ড্রোন প্রতিরোধী সরঞ্জামসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে বলে দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। পাকিস্তানি সামরিক উপদেষ্টারাও সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

তবে পাকিস্তান ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধ করার জন্য সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন। একইভাবে সৌদি আরবকে নিজেদের ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষায় সহায়তা দেওয়ার ওপরই মিত্রদের ভূমিকা সীমিত রাখার কথা বলা হচ্ছে।

সৌদি আরবের আরেকটি উদ্বেগ হলো হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে দেশটির তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষা করা। এ কারণে রিয়াদ কয়েকটি মিত্র দেশের কাছে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সহায়তা চেয়েছে বলে আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বিভক্ত ইয়েমেনি বাহিনী

সম্ভাব্য স্থল অভিযানের বড় অংশই ইয়েমেনি বাহিনীর ওপর নির্ভর করবে। দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধের কারণে হুতিবিরোধী ইয়েমেনি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিভাজন রয়েছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত অতীতে এসব গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিলেও তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থে পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় হুতিদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষ বেড়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকার-সমর্থিত বাহিনী তাইজ প্রদেশে হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে একাধিক বিমান হামলা চালানোর কথাও জানিয়েছে।

এদিকে নতুন করে সংঘাত তীব্র হলে মানবিক পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুতি ও খাদ্যসংকট বাড়ছে। দেশটির বিপুলসংখ্যক মানুষ খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় লোহিত সাগরের নৌপথে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা সরবরাহব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে গঠিত প্রতিরক্ষা জোটের সদস্যরা আগামী সপ্তাহে রিয়াদে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার জানিয়েছেন, হুতিদের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও সেখানে আলোচনায় আসতে পারে। ফলে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের পাশাপাশি কূটনৈতিক পথও আলোচনার বাইরে থাকছে না।