পাটের রেকর্ড দাম, কৃষকের মুখে চওড়া হাসি
পেঁয়াজ, ধানসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করে যেখানে উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়েছে, সেখানে এবার পাট চাষে স্বস্তির মুখ দেখছেন পাবনার কৃষকরা। অনুকূল আবহাওয়া, ভালো ফলন ও আশানুরূপ দাম—সব মিলিয়ে সোনালি আঁশে ফিরেছে কৃষকের হাসি।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে পাবনায় ৪২ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে পাঁচ লাখ ৫৮ হাজার ৯৮৭ বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। জেলার সুজানগর, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর ও সাঁথিয়া উপজেলায় পাটের আবাদ হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
চাষিরা জানান, জেলার উঁচু ও নিচু—দুই ধরনের জমিতেই বিভিন্ন জাতের পাট আবাদ করা হয়েছে। তবে নিচু জমিতে ফলন তুলনামূলক ভালো হয়েছে। এবার পর্যাপ্ত বৃষ্টির কারণে পাট পচানোর জন্যও তেমন ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি। খাল-বিল ও নিচু জমিতে বর্ষার পানি থাকায় পাট জাগ দিতে অতিরিক্ত পানি সংগ্রহ বা দূরে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন কমেছে।
কৃষকদের হিসাবে, এবার বিঘাপ্রতি ৮ থেকে ১৪ মণ পর্যন্ত পাটের ফলন হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আঁশের মান ও উজ্জ্বলতাও ভালো হয়েছে। একই সঙ্গে গত বছরের তুলনায় বাজারদর বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুরের কৃষক বাকু খাঁ বলেন, পেঁয়াজ চাষে ধারাবাহিক লোকসান হলেও এবার পাট কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। তার ভাষ্য, বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর একই সময়ে দাম ছিল প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা।
নিজের জমিতে এবার বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ করে প্রায় ১০ মণ করে পাট পেয়েছেন বলে জানান বাকু খাঁ। এতে খরচ বাদ দিয়ে ভালো লাভ হয়েছে তার। গতবার ফলন ও দাম দুটোই কম থাকায় এবার কম জমিতে পাট আবাদ করেছিলেন বলেও জানান তিনি।
চাটমোহরের চলনবিলের জয়ঘর এলাকার কৃষক রফিকুল ইসলাম এবার সোয়া তিন বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। তিনি জানান, বর্ষার পানি সময়মতো আসায় পাট জাগ দেওয়া নিয়ে সমস্যা হয়নি। দূরে পাট নিতে গাড়ি ভাড়া না লাগায় উৎপাদন খরচও কমেছে। এবার গড়ে বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১২ মণ ফলন পেয়েছেন তিনি। বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা।
তবে সব এলাকায় উৎপাদন খরচ এক নয়। সদর উপজেলার ভাঁড়ারার ঘোড়াদহের কৃষক চন্দন মৃধা জানান, শ্রমিক ও পরিবহন খরচ বেশি হওয়ায় তার এলাকায় বিঘাপ্রতি প্রায় ১৮ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ফলন হয়েছে ৭ থেকে ৮ মণ। তারপরও বাজারদর ভালো থাকায় এবার লাভ থাকবে বলে আশা করছেন তিনি।
সুজানগরে পাট চাষে উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি। কৃষকদের মতে, জমির লিজ ও শ্রমিক খরচ মিলিয়ে বিঘাপ্রতি ব্যয় ২২ থেকে ২৮ হাজার টাকা পর্যন্ত পড়ে। তবে ফলনও ভালো হওয়ায় এবং বাজারদর সন্তোষজনক থাকায় কৃষকরা লাভের আশা করছেন। সেখানে এবার গড়ে বিঘাপ্রতি ১১ থেকে ১২ মণ ফলন হয়েছে; কোনো কোনো কৃষক ১৪ মণ পর্যন্ত পেয়েছেন।
পাট ব্যবসায়ী মো. আবদুল হাসান বলেন, পাবনার পাটের মান বরাবরই ভালো। এবার হাটে সরবরাহও ভালো রয়েছে এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে আঁশ উজ্জ্বল হয়েছে। ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে সন্তোষ দেখা যাচ্ছে।
সুজানগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার উপজেলায় পাটের আবাদ বেড়েছে। পাট রপ্তানির সুযোগ তৈরি হওয়ায় চাহিদা ও বাজারদর বেড়েছে বলে কৃষকদের মধ্যে এ ফসলের প্রতি আগ্রহও বাড়ছে।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. লুৎফর রহমান বলেন, পাবনার মাটি ও আবহাওয়া পাট চাষের জন্য উপযোগী। এ কারণে এ অঞ্চলে পাটের ফলন ভালো হয়। রপ্তানির পাশাপাশি দেশে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো গেলে পাটের চাহিদা ও বাজার আরও সম্প্রসারিত হবে বলে মনে করেন তিনি।
ফলে পেঁয়াজসহ অন্যান্য ফসলে লোকসানের চাপ থাকলেও এবার পাটের ভালো ফলন ও বাজারদর অনেক কৃষকের জন্য স্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। কৃষকদের প্রত্যাশা, বাজারদর স্থিতিশীল থাকলে আগামী মৌসুমে পাটের আবাদ আরও বাড়বে।


