দেশের বিশাল যুবশক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর আহ্বান রাষ্ট্রপতির
ঢাকা, ১ নভেম্বর ২০২৬: দেশের বিশাল যুবশক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, দেশের জনসংখ্যার সবচেয়ে বড় অংশ যুবসমাজ। এই জনমিতিক লভ্যাংশ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বাংলাদেশের জন্য বড় সম্পদ ও সুযোগ। একে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশের সাফল্য অর্জন সম্ভব।
রোববার জাতীয় যুব দিবস-২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ এখনো স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় রয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার প্রস্তুতির সময় আরও তিন বছর বাড়ানো হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে হবে, যাতে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ টিকে থাকতে পারে।
এ ক্ষেত্রে যুবসমাজ সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তরুণেরাই ভবিষ্যতের প্রধান চালিকাশক্তি। ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্বও তাদের হাতে। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে যুবসমাজকে কর্মমুখী করতে হবে এবং উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। শুধু রাজনৈতিক বিপ্লব বা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়; একই সঙ্গে দেশ নির্মাণের কাজও করতে হবে।
যুব উন্নয়নে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিভিন্ন অবদান ও কার্যক্রমের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি।
চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান
যুবসমাজকে শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে স্বনির্ভর ও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, তরুণদের সামনে নিয়ে আসতে হবে এবং দেশ গঠনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের প্রধান ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় যুবসমাজকে সব ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি তাদের সম্ভাবনা বিকাশের পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা রাখা যাবে না।
তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের সাফল্যের প্রশংসা করে তিনি বলেন, স্বল্প পুঁজি নিয়ে অনেক তরুণ-তরুণী বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছেন এবং নিজেদের পণ্য উৎপাদন করছেন। দেশের বাজারের পাশাপাশি রপ্তানিতেও তাঁরা সাফল্য অর্জন করছেন।
বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ তাঁকে মুগ্ধ করেছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, একজন নারী উদ্যোক্তা দেশীয় খাবার ও মিষ্টি তৈরি করে উল্লেখযোগ্য আয় করছেন। এর মাধ্যমে তিনি নিজের পরিবারকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি পণ্য বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগও নিয়েছেন। এ ধরনের সাফল্য অন্যদের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক।
উদ্যোক্তাদের সহায়তায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির পাশাপাশি প্রশিক্ষণ-পরবর্তী ঋণ সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে। এসব উদ্যোগ আরও কার্যকর করতে হবে, যাতে প্রশিক্ষণ, ঋণ ও অন্যান্য সহায়তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় উপযুক্ত উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছায়।
রাষ্ট্রপতি বলেন, এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বেকারত্ব কমানোর পাশাপাশি আত্মনির্ভরশীল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও প্রয়োজনীয় সুযোগ পেলে একজন মানুষ নিজের অবস্থার পরিবর্তনের পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া, সহায়তা করা এবং নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য ন্যূনতম মূলধনের ব্যবস্থা করা বলে উল্লেখ করেন তিনি। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের যথাযথ সহযোগিতা করা গেলে তাঁরা নিজেরাই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবেন।
কারিগরি শিক্ষা ও মাদকবিরোধী উদ্যোগে গুরুত্ব
যুবসমাজকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন রাষ্ট্রপতি।
তরুণদের মাদকাসক্তি থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে যুবসমাজের অন্যতম বড় সমস্যা মাদকাসক্তি। তরুণদের মধ্যে মাদকের আসক্তি যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ আসক্তি প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টি, প্রচারণা এবং কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌতুক, বৈষম্যসহ বিভিন্ন সামাজিক অনিয়মের বিরুদ্ধে যুবসমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। রাষ্ট্রপতি বলেন, এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে তরুণদের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। প্রতিটি অঞ্চলে নিজেদের উদ্যোগে সংগঠন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করতে হবে, যাতে সমাজের জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করা যায়।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বায়োগ্যাসের প্রসার
দেশে বায়োগ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, বায়োগ্যাস প্রকল্পের ধারণা পুরোনো হলেও এটি অত্যন্ত কার্যকর ও উপযোগী। বর্তমানে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে বায়োগ্যাসের ব্যবহার বাড়ানো গেলে চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করা সম্ভব।
এ ধরনের পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রকল্প সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় যুব পুরস্কারপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁদের অর্জন ও সাফল্য দেশের অন্য তরুণ-তরুণীদের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
বক্তব্য শেষে রাষ্ট্রপতি জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী চাকরি মেলা এবং দেশব্যাপী স্থাপিত বায়োগ্যাস প্ল্যান্টগুলোর উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এর আগে তিনি জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ে যুব পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেন।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. আবুল খায়ের ভূঁইয়া এবং মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মাহফুজুল আলম খান।
অনুষ্ঠানে যুব কার্যক্রমের ওপর নির্মিত একটি ভিডিও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এর আগে রাষ্ট্রপতি অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে বিভিন্ন স্টল ও যুবমেলা পরিদর্শন করেন।


