সংবিধান সংশোধনে সবাইকে নিয়ে এগোতে চায় সরকার
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ- ফাইল ছবি
সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণের জন্য সরকার অপেক্ষা করবে। তবে তারা অংশ না নিলেও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সংশোধনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে বিশেষ কমিটির সপ্তম বৈঠক শেষে মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারি দল ও বিরোধী দলসহ সবাইকে নিয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করতে চায় সরকার। এ জন্য বিরোধী দলকে বারবার আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা কমিটিতে প্রতিনিধি দিতে পারবে এবং চাইলে লিখিত মতামতও দিতে পারবে। সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপনের পরও আলোচনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব তৈরি করা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হচ্ছে।
বৈঠকে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে সংশোধনের বিধান, গণভোটের ব্যবস্থা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও এখতিয়ার, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব নিয়ে আলোচনা হয়।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের গণভোট-সংক্রান্ত বিধান বিলুপ্ত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আদালতের রায়ের মাধ্যমে এ বিষয়ে যে পরিবর্তন এসেছে, তা আইনসভার মাধ্যমে কীভাবে বিবেচনা করা যায়, সে বিষয়ে বৈঠকে মতামত এসেছে।
সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি অতিরিক্ত কঠোর বা অতিরিক্ত নমনীয় না করার বিষয়েও বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার গঠনপ্রক্রিয়া ও সম্ভাব্য বিকল্পগুলো নিয়েও মতামত দেন অংশগ্রহণকারীরা। কমিটির সভাপতি জানান, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে যাওয়ার বিধান বিলুপ্ত করার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। আগের বিকল্পগুলোতে সমঝোতা না হলে বিচার বিভাগের ভূমিকা রাখার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখিত প্রস্তাব এখনও পাওয়া যায়নি।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও এখতিয়ার প্রসঙ্গে সংবিধানের ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষমতা এবং মৌলিক কাঠামো-সংক্রান্ত বিষয়ে বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। রাষ্ট্রের এক অঙ্গ যেন অন্য অঙ্গের ওপর অযাচিত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে থাকা কিছু বিষয়কে মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করে বাস্তবায়নযোগ্য করা যায় কি না, তা নিয়েও মতামত এসেছে। পাশাপাশি সংবিধানে জনগণের সার্বভৌমত্বের ধারণা আরও স্পষ্ট করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ বা উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। উচ্চকক্ষে কোন শ্রেণি বা এলাকার প্রতিনিধিত্ব থাকবে, সদস্যরা কীভাবে নির্বাচিত হবেন, জেলাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব থাকবে কি না এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের (পিআর) পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে কি না—এসব বিষয়ে অংশগ্রহণকারীরা মতামত দেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, অনেকে বৈঠকে লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন। অন্যরাও আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে লিখিত মতামত দেবেন বলে জানিয়েছেন। এসব মতামত পর্যালোচনা করে সংশোধনী প্রস্তাব চূড়ান্ত করার বিষয়ে কমিটিতে আলোচনা হবে।
তিনি আরও জানান, আগামী ২৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধি, বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে দিনব্যাপী আলোচনার প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য রেকর্ড করে বিস্তারিত পর্যালোচনার সুযোগ রাখতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ কমিটির সপ্তম বৈঠকে জাতীয় অধ্যাপক মাহবুবুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ, অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন, অধ্যাপক সামিয়া লুৎফা, অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান, অধ্যাপক কে এইচ লুৎফুল এলাহী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. রেজাউল করিম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক একরামুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম ও অধ্যাপক শামীমা সুলতানাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরা অংশ নেন।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ একরামুল হক, সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক নেসার ইউ আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়গুলোর পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রয়োজন, নির্বাচনী ইশতেহার ও জনগণের প্রত্যাশার ভিত্তিতে আরও কিছু বিষয় সংশোধনী প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন হতে পারে।


