সব ধর্মের মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়তে হবে: প্রধানমন্ত্রী
সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে দেশকে প্রত্যাশিত অবস্থানে নিয়ে যেতে হবে। সরকার এমনভাবে দেশ পরিচালনা করতে চায়, যাতে যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন, তারাও যেমন সরকারের সেবা পান, তেমনি যারা ভোট দেননি, তারাও সমানভাবে সরকারের পাশে থাকার সুযোগ পান।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুর পৌনে ১২টার দিকে রংপুরের ঐতিহাসিক ধর্মসভা বা রাধা গোবিন্দ মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে লড়াই করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছেন। এখন একইভাবে সবাইকে মিলেমিশে দেশ গড়ার কাজে অংশ নিতে হবে। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দেশের মানুষ বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সরকার খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে, চালু করা হয়েছে ফ্যামিলি কার্ড। শিগগিরই কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য মাসিক ভাতার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সমাজের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকার কাজ করছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং নিরাপদ জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
গণঅভ্যুত্থান নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান
বক্তব্যে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি মহল বিভিন্ন সময়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। অতীতেও মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার চেষ্টা হয়েছিল, যা দেশের মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। একইভাবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে বিতর্কিত করার প্রচেষ্টার বিষয়েও সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ‘আমি সকলকে সঙ্গে নিয়ে, গণতন্ত্রকামী জনগণের পক্ষ থেকে বলতে চাই, আপনারা কেউ চব্বিশের ছাত্র-জনতার যে গণঅভ্যুত্থান, সেটিকে দয়া করে বিতর্কিত করবেন না।’
কারও কোনো বক্তব্য, দাবি বা মতপার্থক্য থাকলে তা জাতীয় সংসদে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণ তাদের প্রতিনিধিদের সংসদে পাঠিয়েছে। সেখানে আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে জনগণ এবং রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পর্যন্ত বিভিন্ন ধর্ম, মত ও শ্রেণি-পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নিয়েছেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানেও দল, মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ছিল।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করছেন। ভবিষ্যতেও যাতে সবাই শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারেন, সে পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
রংপুরের উন্নয়নে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ
রংপুরের উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের সব অঞ্চলের উন্নয়ন অর্থনৈতিক সামর্থ্য বিবেচনায় সুষমভাবে এগিয়ে নিতে চায় সরকার। এর অংশ হিসেবে গত দুই সপ্তাহে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় রংপুর মহানগরীর উন্নয়নে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে রংপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামের অবকাঠামো উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে সেতু, কালভার্ট, স্কুল ও কলেজ নির্মাণের বিষয়ও রয়েছে।
উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভেদ ভুলে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, জনগণ দেশে স্থিতিশীলতা, শান্তি ও নিরাপত্তা চায়। সরকারের লক্ষ্যও মানুষের এসব প্রত্যাশা পূরণ করা।
বক্তব্যের শেষে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে শারদীয় দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সবার দেশ। দেশের উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে সব ধর্মের মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
সৈয়দপুর থেকে রংপুরে প্রধানমন্ত্রী, পথে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা
এর আগে মঙ্গলবার সকালে সামরিক বিমানে নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে সড়কপথে রংপুরে যাওয়ার সময় বিভিন্ন এলাকায় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ তাকে শুভেচ্ছা জানান। তারাগঞ্জ ও পাগলাপীর এলাকায় সংক্ষিপ্ত পথসভায় বক্তব্য দেন তিনি।
যাত্রাপথে সৈয়দপুর বিজ্ঞান কলেজের সামনে শিক্ষার্থীদের দেখে গাড়ি থামান প্রধানমন্ত্রী। এ সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের সঙ্গে সেলফি তোলেন ও অটোগ্রাফ দেন। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির খোঁজখবর নেন তিনি।
রংপুরে পৌঁছালে ধর্মসভা মন্দির কমিটির সভাপতি ভবতোষ সরকার বাচ্চু, সাধারণ সম্পাদক খোকন সরকার, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ রংপুর জেলার সভাপতি রাম জীবন কুণ্ডু, মহানগর পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রশান্ত কুমার রায় ও সদস্য সচিব পলাশ কান্তি নাগ প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে রংপুর ও নীলফামারীতে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। বিভিন্ন সড়কের দুই পাশে মানুষ পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে তাকে স্বাগত জানান। প্রধানমন্ত্রীও গাড়ি থেকে হাত নেড়ে তাদের শুভেচ্ছার জবাব দেন।


