যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনই নির্ধারণ করবে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির শেষ অধ্যায়

জাতীয়
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনই নির্ধারণ করবে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির শেষ অধ্যায়
৩ নভেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে গত এক দশক ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর নেতৃত্বে দেশটির রাজনৈতিক অবস্থান, নীতিনির্ধারণ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এসেছে নানা পরিবর্তন। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদের শেষ দুই বছরে প্রবেশের আগেই বড় রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখে পড়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। একই সঙ্গে স্পষ্ট হবে, ট্রাম্পের নেতৃত্ব ও নীতির প্রতি মার্কিন ভোটারদের বর্তমান মনোভাব।

এবারের নির্বাচন রিপাবলিকান পার্টির জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক চাপ এবং ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ দলটির নির্বাচনী অবস্থানকে দুর্বল করে তুলেছে। ফলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার পাশাপাশি নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান টিকিয়ে রাখাও রিপাবলিকানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জীবনযাত্রার ব্যয়ই ভোটের প্রধান ইস্যু

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

মার্কিন ভোটারদের বড় একটি অংশের কাছে বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয়। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে জ্বালানি—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি খরচের চাপ অনুভব করছেন সাধারণ মানুষ। ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রাসী শুল্কনীতি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি পণ্যের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে।

সাম্প্রতিক সময়ে জনসমর্থনের দিক থেকেও কঠিন পরিস্থিতির মুখে রয়েছেন ট্রাম্প। বিভিন্ন জনমত জরিপে তাঁর জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারে সরাসরি অংশ নিয়েছেন তিনি। দেশজুড়ে কয়েক ডজন নির্বাচনী সমাবেশে যোগ দিয়ে ভোটারদের দলটির প্রার্থীদের সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

এবারের নির্বাচনে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোতেও ভোটের হিসাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের শেষ সপ্তাহান্তে আইওয়া ও কানসাসে প্রচার চালিয়েছেন ট্রাম্প। এসব অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের প্রভাব থাকলেও এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে।

এমনকি নিজেদের নিশ্চিত জয়ের আসন হিসেবে বিবেচিত এলাকাগুলোতেও নির্বাচনী বিজ্ঞাপনে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে রিপাবলিকানদের। কানসাসের সিনেট নির্বাচন এ ক্ষেত্রে অন্যতম উদাহরণ।

নির্বাচন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ক্যারি ড্যানের মতে, কোনো অঙ্গরাজ্যে জয়ের বিষয়ে রাজনৈতিক দলের আত্মবিশ্বাস থাকলে সেখানে বিপুল অর্থ ব্যয় করে প্রচারণা চালানোর প্রয়োজন হয় না। কিন্তু নিশ্চিত জয়ের প্রত্যাশিত এলাকাতেও যখন বিজ্ঞাপনে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করতে হয়, তখন দলটির অভ্যন্তরীণ উদ্বেগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কানসাসে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ব্যয় প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। এতে বোঝা যায়, এবারের নির্বাচনে অনেক জায়গায় আক্রমণাত্মক অবস্থানের পরিবর্তে নিজেদের আসন রক্ষার লড়াই করতে হচ্ছে দলটিকে।

ট্রাম্পের সমর্থন কি এখন রিপাবলিকানদের জন্য বোঝা?

নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প নিজেকে কার্যত প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করে ভোটারদের কাছে সমর্থন চেয়েছেন। গত মাসে এক সমাবেশে তিনি ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, তাঁকে ব্যালটে রাখা হয়েছে—এমনটি কল্পনা করে যেন তাঁরা ভোট দেন। নির্বাচনের আগের রোববার আইওয়ার সমাবেশেও একই ধরনের আবেদন জানান তিনি।

তবে এবারের নির্বাচনে ট্রাম্প নিজে প্রার্থী নন। ফলে তাঁর উপস্থিতি রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়ে হোয়াইট হাউসে ফিরেছিলেন ট্রাম্প। তখন তাঁর জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক প্রভাব ছিল বেশ শক্তিশালী। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও রিপাবলিকান প্রার্থীরা তাঁর সমর্থন পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করেছেন।

কিন্তু এবার সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘায়িত যুদ্ধ এবং এর ফলে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের বাড়তি ব্যয়ের চাপ ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

যুদ্ধ শুরুর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন ডিজেল জ্বালানির দাম ছিল ৩ ডলার ৭৫ সেন্ট। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ ডলার ৫২ সেন্টে। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি বিশেষ করে কৃষিনির্ভর অঙ্গরাজ্যগুলোর মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।

আইওয়ার এক ভোটার জানিয়েছেন, তাঁর ছেলে গাড়ি চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার সময় বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে ফোন করে জ্বালানির দাম জানাচ্ছিলেন। প্রতিবার দাম শোনার পর তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল বিস্ময় ও হতাশার।

এদিকে ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের সময় যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৩ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্কনীতি কার্যকর না হলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও কম থাকতে পারত।

রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও বাড়ছে অনিশ্চয়তা

অর্থনৈতিক চাপের প্রভাব পড়েছে রিপাবলিকানদের ঐতিহ্যগত সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যেও। টেক্সাস, ওহাইও, কানসাস ও আইওয়ার মতো অঙ্গরাজ্যে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র আগের তুলনায় ভিন্ন।

জনমত জরিপকারী প্রতিষ্ঠান মোর ইন কমনের বৈশ্বিক গবেষণা পরিচালক স্টিফেন হকিন্স বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল, মধ্য-পশ্চিমাঞ্চল ও কৃষিনির্ভর কেন্দ্রীয় অঞ্চলগুলো সাধারণত রিপাবলিকানদের শক্তিশালী নির্বাচনী ঘাঁটি। অথচ এবার এসব অঞ্চলের কয়েকটি সিনেট নির্বাচন সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তাঁর মতে, মাত্র দুই বছর আগে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প যেসব অঙ্গরাজ্যে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন, সেখানেও এবার ডেমোক্র্যাটদের সিনেট আসন জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

আইওয়ার কয়েকজন ভোটারের বক্তব্যেও ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষের বিষয়টি উঠে এসেছে। রিপাবলিকান সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেওয়া পল রস মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের উপস্থিতি তাঁর দলের প্রার্থীদের জন্য উল্টো ক্ষতির কারণ হতে পারে।

আরেক ভোটার জ্যাক শিম্পের মতে, ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে বিরক্ত হয়ে অনেক ভোটার রিপাবলিকানদের কাছ থেকে সরে যেতে পারেন। রোজ হেমিং নামের আরেক ভোটারও যুদ্ধ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

তবে ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষ মানেই ডেমোক্র্যাটদের প্রতি সমর্থন—এমনটি মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা।

ট্রাম্পবিরোধিতা থাকলেও ডেমোক্র্যাটদের প্রতি আস্থা কতটা?

নির্বাচনের আগে প্রকাশিত বিভিন্ন জনমত জরিপে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থনের হার প্রায় ৩৮ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন মাত্র ২৯ শতাংশ ভোটার। রোববার প্রকাশিত এনবিসির জাতীয় পর্যায়ের জরিপেও প্রায় একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে।

অর্থাৎ, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি অসন্তোষ থাকলেও বিকল্প হিসেবে ডেমোক্র্যাটদের গ্রহণ করতে ভোটারদের একটি অংশ এখনো দ্বিধায় রয়েছে।

২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া আইওয়ার রিপাবলিকান সমর্থক টিম ম্যাককিনন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতে, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িয়ে পড়া সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

তবে এসব বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও ম্যাককিনন ও তাঁর মতো রক্ষণশীল ভোটারদের ডেমোক্র্যাটদের সমর্থক হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। তাঁদের কাছে খ্রিষ্টীয় ও রক্ষণশীল মূল্যবোধ এখনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

ম্যাককিননের বক্তব্য, জ্বালানির দাম বাড়লেই তাঁদের বিশ্বাস ও আদর্শ পরিবর্তিত হয়ে যাবে না।

এদিকে মিশিগানের ডেট্রয়েটের বাসিন্দা নিকোল উইলিয়ামস মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শিক বিতর্কের চেয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো বেশি জরুরি। নিজের হেয়ারড্রেসিং সেলুন পরিচালনাকারী এই ভোটারের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির চেয়ে ভালো কিছু হলেই তিনি তা সমর্থন করবেন।

অঙ্গরাজ্যটির আরেক ভোটার গয়েন জ্যাকসনও পরিবর্তনের প্রত্যাশা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা রাজনৈতিক অঙ্গনে অসম্মান ও বিভাজনের রাজনীতি দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।

২০২৮ সালের নির্বাচন ঘিরেও ডেমোক্র্যাটদের প্রস্তুতি

মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়েও ভাবছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। আগামী নির্বাচনে দলকে ঐক্যবদ্ধ করে একজন গ্রহণযোগ্য প্রার্থী সামনে আনা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

এবারের প্রচারাভিযানেই দলটির অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। গত সপ্তাহান্তে মিশিগানেও ডেমোক্র্যাট নেতাদের মধ্যে বিরোধ দেখা গেছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে আগামী দুই বছরের রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করতে চায় দলটি। বিশেষ করে টেক্সাসের মতো রিপাবলিকান-প্রধান অঙ্গরাজ্যে জয় পাওয়ার সম্ভাবনা এবং গ্রামীণ ভোটারদের সমর্থন আদায়ের বিষয়টি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জর্জিয়ার জন অসফ ও টেক্সাসের জেমস তালারিকোর মতো উদীয়মান নেতারা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান কতটা শক্তিশালী করতে পারেন, সেটিও পর্যবেক্ষণ করছে দলটি।

মোর ইন কমনের গবেষণা পরিচালক স্টিফেন হকিন্স মনে করেন, এবারের নির্বাচন ডেমোক্র্যাটদের জন্য শুধু কংগ্রেসে আসন বাড়ানোর সুযোগ নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের কোন কোন অঞ্চলে তারা কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে সক্ষম, সেই ধারণা পরিবর্তনেরও সুযোগ।

প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনা

মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারানোর ঝুঁকিতে থাকে। ট্রাম্পের বর্তমান জনসমর্থনের নিম্নমুখী অবস্থান এবং সাম্প্রতিক জরিপের ফলাফল বিবেচনায় প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী ডেমোক্র্যাটরা।

ডেমোক্র্যাটিক দলের কৌশলবিদ মেরি অ্যান মার্শের মতে, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হচ্ছে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ। তাঁর ধারণা, এসব বিষয়ে ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়ে যাওয়া রিপাবলিকান প্রার্থীদের নির্বাচনে এর মূল্য দিতে হতে পারে।

প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়ন ও নীতিগত উদ্যোগে বাধা সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবিত বিভিন্ন আইন আটকে দেওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি বাড়াতে পারবে বিরোধী দল।

এ ছাড়া বিভিন্ন ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার সুযোগ তৈরি হবে। এমনকি মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগও নিতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালেও ট্রাম্প প্রশাসন পুরোপুরি অচল হয়ে পড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ, এরই মধ্যে কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রবণতা দেখিয়েছেন তিনি।

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কঠিন সমীকরণ

প্রতিনিধি পরিষদের তুলনায় সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া ডেমোক্র্যাটদের জন্য অনেক বেশি কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে।

এবার সিনেটের ৩৫টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বর্তমানে নিজেদের অবস্থান থেকে নিট চারটি আসন বাড়াতে পারলে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে ডেমোক্র্যাটদের। তবে মিশিগানের আসনটি হারালে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য তাদের নিট পাঁচটি আসন বাড়াতে হবে।

মিশিগান, টেক্সাস, ওহাইও, আইওয়া, মেইন, আলাস্কা ও নর্থ ক্যারোলাইনার সিনেট নির্বাচন এবার বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব অঙ্গরাজ্যের কয়েকটি আসনে দুই প্রার্থীর মধ্যে সমর্থনের ব্যবধান এতটাই কম যে, জনমত জরিপের সম্ভাব্য ভুলের সীমার মধ্যেই রয়েছে।

ফলে শেষ মুহূর্তে ভোটের হিসাব বদলে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে জনমত জরিপের নির্ভুলতা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন নির্বাচনে ট্রাম্পের সমর্থন কম এবং ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন বেশি দেখানোর প্রবণতা দেখা গেছে। ট্রাম্পের ধারণা, এবারও জরিপের পূর্বাভাস ভুল প্রমাণিত হতে পারে এবং তিনি সবাইকে চমকে দিতে পারবেন।

তবে জরিপের পূর্বাভাস বাস্তবের কাছাকাছি হলে রিপাবলিকানদের ঐতিহ্যগত শক্তিশালী অঙ্গরাজ্যগুলোতেও বড় ধরনের নির্বাচনী বিপর্যয় ঘটতে পারে।

পরাজয় মেনে নেবেন তো ট্রাম্প?

নির্বাচনে প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ ফল হলে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া কী হবে, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। অতীতে একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

এবারও ভোট গণনার সময় কিংবা ফলাফল ঘোষণার পর নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার সম্ভাবনা রয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ।

তবে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু দুই দলের আসনসংখ্যার লড়াই নয়; বরং ট্রাম্পের নেতৃত্ব, তাঁর নীতিনির্ধারণ এবং আগামী দিনের যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণেরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে মেয়াদের শেষ দুই বছরে ট্রাম্পের নীতিগুলো বাস্তবায়নের সুযোগ আরও বাড়বে। বিপরীতে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে তাঁর প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ বাড়বে।

সব মিলিয়ে, এবারের নির্বাচনের ফলাফল ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগেই যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের শক্তি ও দুর্বলতার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরতে পারে। একই সঙ্গে নির্ধারিত হবে, ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কতটা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে এবং তাঁর মেয়াদের শেষ দুই বছর কতটা নির্বিঘ্নে কাটবে।