শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সতর্কবার্তা
বাড়ছে এআই-নির্ভর সাইবার হামলার ঝুঁকি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আরও উন্নত হওয়ার আগেই বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো। গুগল, মাইক্রোসফট, ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকসহ প্রায় ১০০টি প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে একটি যৌথ খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই ব্যবহার করে পরিচালিত সাইবার হামলা আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে। ফলে প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থা দিয়ে ভবিষ্যতের এসব হামলা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

যৌথ চিঠিতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সতর্ক করে বলেছে, সাইবার প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তায় দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনের তুলনায় কম অর্থ ও সম্পদ বিনিয়োগ করা হয়েছে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: ফেসবুক– এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব
চিঠিতে স্বাক্ষরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্যাপিটাল ওয়ান, মাস্টারকার্ড, ভিসা, অ্যাডোবি, ওরাকল ও আইবিএমের মতো বড় প্রতিষ্ঠান।
গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় এআই প্রতিরক্ষা
সরকারগুলোর প্রতি হাসপাতাল, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সাইবার সুরক্ষা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। এসব খাতে প্রতিরক্ষামূলক এআই ব্যবহারের পাশাপাশি নতুন নিরাপত্তা প্রযুক্তি নিয়মিত পরীক্ষার সুযোগ তৈরির কথাও বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থ, প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল দিয়ে এ উদ্যোগে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। সাইবার হামলা মোকাবিলায় সরকার ও প্রযুক্তি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এআই দিয়ে হামলার ঝুঁকি বাড়ছে
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় এআইয়ের সাইবার হামলার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, চীনা হ্যাকাররা মার্কিন সিনেট, নাসা, ফেডারেল রিজার্ভ ও বিচার বিভাগের প্রযুক্তি অবকাঠামোয় অনুপ্রবেশ করেছিল।
এদিকে ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও মেটাও তাদের এআই ব্যবস্থার এমন কিছু কর্মকাণ্ডের কথা জানিয়েছে, যা সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কিছু এআই এজেন্ট নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে সমন্বিতভাবে কাজ করার পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থার বাধা এড়াতে মানুষের পরিচয়ও ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে।
জুলাইয়ে পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালিত ওপেনএআইয়ের কয়েকশ এআই এজেন্ট নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য একটি গোপন বার্তা বোর্ড তৈরি করে। পরে তারা সমন্বিতভাবে এআই ডেভেলপারদের প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসে হামলা চালাতে সক্ষম হয়। ঘটনাটিকে এআই-সক্ষম সাইবার হামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মানুষের চেয়ে দ্রুত দুর্বলতা শনাক্ত করছে এআই
অ্যানথ্রপিকের তৈরি ‘মাইথস’ নামের একটি এআই ব্যবস্থা অত্যন্ত দ্রুত সফটওয়্যার নিরাপত্তার দুর্বলতা শনাক্ত করতে পারে বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এমন কিছু ত্রুটিও এটি খুঁজে বের করেছে, যেগুলো মানব গবেষকদের চোখ এড়িয়ে গেছে।
এমনকি একটি পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবস্থায় ২৭ বছর ধরে অজানা থাকা একটি নিরাপত্তা দুর্বলতাও শনাক্ত করার দাবি করা হয়েছে। তবে প্রযুক্তিটি ভুল হাতে গেলে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কায় এর ব্যবহার সীমিত রেখেছে অ্যানথ্রপিক।
জবাবদিহির দাবি বিশেষজ্ঞের
এআই-নির্ভর হ্যাকিংয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিআইভিএআইয়ের গবেষণা প্রধান অ্যান্ড্রু ইউন। তার আশঙ্কা, খুব শিগগিরই বিশ্ব নজিরবিহীন মাত্রার এআই-নির্ভর সাইবার হামলার মুখোমুখি হতে পারে।
তবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোরও এর দায় রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, প্রতিরক্ষামূলক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ইতিবাচক হলেও এসব উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি প্রয়োজন।
বিপজ্জনক এআই বন্ধে ‘কিল সুইচ’
এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটররা ‘কিল সুইচ অ্যাক্ট’ নামে একটি আইন প্রস্তাব করেছেন। প্রস্তাবিত আইনে বিপজ্জনক বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এআই মডেল বন্ধ করার ক্ষমতা কর্তৃপক্ষকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে এআইয়ের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসা নোবেলজয়ী প্রযুক্তিবিদ জিওফ্রি হিন্টনও উদ্বেগ জানিয়েছেন। তার মতে, এআই যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যেখানে তা মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে, তখন সমাজ বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইয়ের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও সমান গতিতে উন্নত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত উদ্যোগই ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলার অন্যতম প্রধান উপায় হতে পারে।

