শর্করা বাদ দেয়ার জটিলতা
ডায়াবেটিসে কখন কী খাবেন
ডায়াবেটিস বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই বাড়ছে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। শুধু বয়স্কদের মধ্যেই নয়, তরুণ, কিশোর এমনকি শিশুদের মধ্যেও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
ডায়াবেটিস পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ বা ইনসুলিনের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। প্রতিদিনের খাবার রক্তে গ্লুকোজের মাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলে বলে খাদ্যাভ্যাসকে রোগ নিয়ন্ত্রণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অনেকের ধারণা, ডায়াবেটিস হলে ভাত-রুটি বা সব ধরনের শর্করা একেবারে বাদ দিতে হবে। আবার কেউ মনে করেন, ওষুধ খেলেই খাবারের বিষয়ে আর সতর্ক থাকার প্রয়োজন নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুটি ধারণাই সঠিক নয়।
ডায়াবেটিস রোগীর খাবারের মূলনীতি
ডায়াবেটিস রোগীর জন্য আলাদা কোনো ‘বিশেষ খাবার’ প্রয়োজন নেই। পরিবারের অন্য সদস্যদের স্বাস্থ্যকর খাবারই পরিমিত পরিমাণে এবং নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া যায়।
খাদ্যতালিকায় গুরুত্ব দিতে হবে—
- পরিমিত ক্যালোরি
- নির্দিষ্ট সময়ে খাবার গ্রহণ
- পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার
- কম চিনি
- পরিমিত শর্করা
- পর্যাপ্ত প্রোটিন
- স্বাস্থ্যকর চর্বি
- পর্যাপ্ত পানি
সহজ নিয়ম ‘প্লেট মডেল’
খাবারের পরিমাণ ঠিক রাখার সহজ একটি পদ্ধতি হলো ‘ডায়াবেটিস প্লেট মডেল’। ৯ থেকে ১০ ইঞ্চি একটি প্লেটকে তিন ভাগে ভাগ করে খাবার সাজানো যেতে পারে।
প্লেটের অর্ধেক (৫০ শতাংশ): শাকসবজি। যেমন—লাউ, পুঁইশাক, পালংশাক, লালশাক, ডাঁটা, করলা, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, ঢেঁড়স, শসা ও টমেটো।
এক-চতুর্থাংশ (২৫ শতাংশ): শর্করা। যেমন—ভাত, আটার রুটি, লাল চাল, ব্রাউন রাইস, ওটস, ভুট্টা ও সীমিত পরিমাণ আলু।
এক-চতুর্থাংশ (২৫ শতাংশ): প্রোটিন। যেমন—মাছ, মুরগি, ডিম, ডাল, ছোলা, মসুর, মুগ, রাজমা, সয়াবিন ও পরিমিত চর্বিহীন মাংস।
রান্নায় পরিমাণমতো স্বাস্থ্যকর তেল ব্যবহার করা উচিত।
দিনের খাবার কেমন হতে পারে
সকালের নাশতা: দুইটি আটার রুটি, একটি সেদ্ধ ডিম ও সবজি খাওয়া যেতে পারে। সঙ্গে চিনি ছাড়া দুধ বা চা নেওয়া যায়। বিকল্প হিসেবে ওটস, দুধ ও অল্প বাদাম রাখা যেতে পারে।
মধ্যসকালের নাশতা: একটি আপেল, কমলা, নাশপাতি বা শসা খাওয়া যেতে পারে।
দুপুরের খাবার: প্লেটের অর্ধেক সবজি, এক-চতুর্থাংশ ভাত এবং বাকি অংশে মাছ, মুরগি বা ডাল রাখা যেতে পারে। সঙ্গে সালাদ যোগ করা যায়।
বিকেলের নাশতা: ভাজা ছোলা, চিনি ছাড়া টক দই বা অল্প পরিমাণ বাদাম খাওয়া যেতে পারে।
রাতের খাবার: দুপুরের মতোই পরিমিত খাবার রাখা ভালো। সম্ভব হলে ঘুমানোর অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করা উচিত।
ডায়াবেটিসে ফল খাওয়া যাবে?
অবশ্যই ফল খাওয়া যায়। ফল থেকে ভিটামিন, খনিজ, আঁশ ও বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাওয়া যায়। তবে ফলের ক্ষেত্রেও পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ।
তুলনামূলকভাবে কম মিষ্টি ফল হিসেবে আপেল, নাশপাতি, কমলা, মাল্টা, পেয়ারা, জাম, ড্রাগন ফল, স্ট্রবেরি, পেঁপে ও কিউই বেছে নেওয়া যেতে পারে।
আম, কলা, আঙুর, লিচু, কাঁঠাল, তরমুজ ও আনারসের মতো তুলনামূলক বেশি মিষ্টি ফল পরিমাণ বুঝে খেতে হবে। একসঙ্গে বেশি ফল না খেয়ে পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো।
ফলের জুস কেন নয়?
ফল চটকে বা ব্লেন্ড করে জুস বানালে আঁশের উপকার কমে যেতে পারে এবং দ্রুত বেশি পরিমাণে ফলের চিনি গ্রহণ হয়ে যায়। তাই সাধারণত জুসের পরিবর্তে গোটা ফল খাওয়াই ভালো।
কোন সবজি বেশি খাবেন?
বাংলাদেশে সহজলভ্য অনেক সবজিই ডায়াবেটিসের খাদ্যতালিকায় রাখা যায়। যেমন—করলা, লাউ, পটল, ঝিঙা, পালংশাক, পুঁইশাক, মুলা, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শসা, টমেটো, ঢেঁড়স, বেগুন ও কচুশাক।
তবে কোনো একটি খাবারকে ‘ডায়াবেটিস সারানোর খাবার’ হিসেবে না দেখে সামগ্রিক খাদ্যতালিকার ভারসাম্যের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
আলু, মিষ্টিকুমড়া ও ডাল কি খাওয়া যাবে?
আলু: খাওয়া যায়, তবে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আলু খেলে একই খাবারে ভাত বা অন্য শর্করার পরিমাণ কমানো যেতে পারে।
মিষ্টিকুমড়া: এতে কার্বোহাইড্রেট রয়েছে, তাই পরিমিত পরিমাণে খাওয়া ভালো।
ডাল: ডালে প্রোটিন ও আঁশ রয়েছে। পরিমিত পরিমাণে ডাল ডায়াবেটিসের খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে।
বাদাম: কাঠবাদাম, আখরোট ও লবণ ছাড়া চিনাবাদাম খাওয়া যায়। তবে এতে ক্যালোরি বেশি থাকায় পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
দুধ ও দই: কম চর্বিযুক্ত দুধ এবং চিনি ছাড়া টক দই তুলনামূলক ভালো বিকল্প হতে পারে। মিষ্টি দই এড়িয়ে চলা উচিত।
যেসব খাবার সীমিত করবেন
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত শর্করাযুক্ত খাবার কমানো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে—
- কোমল পানীয় ও সফট ড্রিংক
- এনার্জি ড্রিংক
- মিষ্টি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার
- রসগোল্লা ও জিলাপি
- কেক ও পেস্ট্রি
- অতিরিক্ত বিস্কুট
- চকলেট
- অতিরিক্ত চিনি
- বেশি পরিমাণ গুড়
- বেশি পরিমাণ মধু
শর্করা কি পুরোপুরি বাদ দিতে হবে?
না। শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট শরীরের অন্যতম প্রধান শক্তির উৎস। তাই ডায়াবেটিস হয়েছে বলে ভাত বা রুটি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া প্রয়োজন নেই।
বরং কী ধরনের শর্করা খাওয়া হচ্ছে, কতটুকু খাওয়া হচ্ছে এবং দিনের কোন সময়ে খাওয়া হচ্ছে—এসব বিষয়ে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অতিরিক্ত কম শর্করাযুক্ত খাদ্যাভ্যাস বিশেষ করে ইনসুলিন বা নির্দিষ্ট কিছু ডায়াবেটিসের ওষুধ ব্যবহারকারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খাবার থেকে শর্করা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
ভাত খাওয়ার সঠিক পদ্ধতি
ভাত খাওয়ার সময় বড় প্লেটে বেশি পরিমাণ ভাত না নিয়ে ছোট প্লেট ব্যবহার করা যেতে পারে। ভাতের সঙ্গে বেশি সবজি এবং উপযুক্ত পরিমাণ মাছ, মুরগি বা ডাল রাখুন। ধীরে ধীরে খাবার খাওয়ার অভ্যাসও উপকারী।
রান্নার পদ্ধতিতেও নজর দিন
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে খাবারের উপাদানের পাশাপাশি রান্নার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। সেদ্ধ, ভাপে, গ্রিল বা কম তেলে রান্না করা খাবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।
অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার, বারবার ব্যবহার করা তেল এবং অতিরিক্ত ঘি বা মাখন কমানো উচিত।
ব্যায়ামও জরুরি
খাদ্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাধারণভাবে সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য রাখা হয়। সপ্তাহে কয়েক দিন পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়ামও উপকারী হতে পারে।
দীর্ঘ সময় একটানা বসে না থেকে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটাচলা করার অভ্যাস করা ভালো।
ডায়াবেটিস নিয়ে ১০টি প্রচলিত ভুল ধারণা
১. ডায়াবেটিস হলে ভাত একেবারেই খাওয়া যাবে না।
২. ডায়াবেটিসে ফল খাওয়া নিষিদ্ধ।
৩. মধু খেলে রক্তে শর্করা বাড়ে না।
৪. শুধু চিনি বাদ দিলেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে।
৫. ‘ডায়াবেটিক বিস্কুট’ যত খুশি খাওয়া যায়।
৬. ওষুধ খেলেই খাদ্য নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন নেই।
৭. বাদাম ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ক্ষতিকর।
৮. ডাল খেলেই রক্তে শর্করা বেড়ে যায়।
৯. চিনির বদলে গুড় খেললে সমস্যা নেই।
১০. শুধু খাবার নিয়ন্ত্রণ করলেই ব্যায়ামের প্রয়োজন নেই।
এসব ধারণার অনেকগুলোই ভুল বা অতিরঞ্জিত। ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় খাবার, শারীরিক কর্মকাণ্ড, ওষুধ এবং নিয়মিত চিকিৎসা—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।
কারা বিশেষ সতর্ক থাকবেন?
কিডনি বা লিভারের রোগী, গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি, শিশু, বয়স্ক এবং ইনসুলিন ব্যবহারকারীদের খাদ্যতালিকা সবার মতো হবে না। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাবারের পরিকল্পনা করা উচিত।
পানি পর্যাপ্ত পরিমাণে পান করা প্রয়োজন। তবে কিডনি বা হৃদ্রোগের কারণে যাদের তরল গ্রহণে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করবেন।
সচেতন খাদ্যাভ্যাসই বড় হাতিয়ার
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন গড়ে তোলা জরুরি। সুষম খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ—সব মিলিয়েই ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনা করতে হয়।
সবচেয়ে সহজভাবে মনে রাখার নিয়ম হতে পারে—প্লেটের অর্ধেক সবজি, এক-চতুর্থাংশ শর্করা এবং এক-চতুর্থাংশ প্রোটিন। তবে ব্যক্তির বয়স, ওজন, শারীরিক অবস্থা, ওষুধ এবং রক্তে গ্লুকোজের মাত্রার ওপর খাদ্যতালিকার প্রয়োজনীয়তা ভিন্ন হতে পারে।
তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নিজের মতো করে কঠোর খাদ্যাভ্যাস শুরু না করে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।


