অন্তর্বতি সরকারের এক বছর: উচ্চ প্রত্যাশা, মিশ্র অর্জন, বড় চ্যালেঞ্জ
গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের পর গত বছরের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আজ এক বছর পূর্ণ করল। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত এই সরকার দেশের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের ঘোষণা দিয়েও বাস্তবতায় নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।
প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী, বাস্তবতা ভিন্ন
জনগণের প্রত্যাশা ছিল দুর্নীতি, দলীয়করণ ও প্রশাসনিক অচলাবস্থা কাটিয়ে একটি কার্যকর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। যদিও সরকার সংস্কার উদ্যোগে এগিয়েছে, বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো অনুপস্থিত—এমনটাই মত বিশ্লেষকদের।
১১টি সংস্কার কমিশন: পরিকল্পনা আছে, বাস্তবায়ন দুর্বল
সরকার গঠন করে ১১টি সংস্কার কমিশন, যার মধ্যে সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন ও বিচার বিভাগে সংস্কারের সুপারিশ তুলে ধরা হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানায়, এ পর্যন্ত ১২১টি সুপারিশের মধ্যে মাত্র ১৬টি বাস্তবায়িত হয়েছে, অধিকাংশ এখনো প্রক্রিয়াধীন।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়ার মতে, “সংস্কারের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নের দক্ষতা ও কৌশলগত সমন্বয়ের ঘাটতি সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।”
আইনশৃঙ্খলা ও মব ভায়োলেন্স: সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা
বছরের শুরু থেকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অস্থির। খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষত ছাত্র ও কর্মচারীদের লাগাতার আন্দোলন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর sporadic হামলা এবং প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা সমালোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
অর্থনৈতিক অর্জনকে ম্লান করে দিয়েছে এই আইনশৃঙ্খলা ব্যর্থতা—এমনটাই মনে করছেন সমাজ বিশ্লেষকরা।
অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে
অর্থনীতির কিছু খাতে, বিশেষত রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে উল্লেক্ষযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। ইপিবি’র তথ্যমতে, জুলাইয়ে বাংলাদেশ ৪.৭৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৫% বেশি। রেমিট্যান্স বেড়ে ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
টাকার মান বৃদ্ধি ও বৈদেশিক বিনিয়োগেও সরকার কিছু ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে, যেমন চীনের হানদা গ্রুপের ২৫ কোটি ডলারের বিনিয়োগ।
প্রশাসনে চরম বিশৃঙ্খলা ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ
সরকার দায়িত্ব নিয়ে আওয়ামী ঘরানার বহু কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিয়ে বিএনপি ও অন্যান্য গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠদের নিয়োগ দেয়, যার মধ্যে অনভিজ্ঞতা ও অদক্ষতার অভিযোগ ছিল প্রবল। অনেক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ ওঠে।
সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, “সরকার একটি স্মার্ট টিম গঠন করতে পারেনি। উপদেষ্টাদের মধ্যেও সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল। একধরনের আমলাতান্ত্রিক সিন্ডিকেটে সরকার নিজেই জিম্মি হয়ে গেছে।”
জনগণের চোখ এখন নির্বাচনের দিকে
সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো একটি গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচন আয়োজন। অনেকেই মনে করছেন, এই নির্বাচনের ব্যবস্থাপনায় সফলতা না এলে সরকারের সমালোচনার পাল্লা আরও ভারী হবে।
সরকারের ব্যাখ্যা: ‘চ্যালেঞ্জ থাকা স্বত্বেও অগ্রগতি হয়েছে’
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, “বিভিন্ন পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েনি। একটি-দুটি আলোচিত ঘটনা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে কাজ করছে এবং কমিশনগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।”


