বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে ঈশ্বরদীর রূপপুর
বাংলাদেশের প্রথম ও সবচেয়ে ব্যয়বহুল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি পর্যায়ে রয়েছে। প্রথম ইউনিটের কমিশনিং কার্যক্রমে প্রেসার অপারেটেড রিলিফ ভালভের (পিওআরভি/পিওএসভি) ১৬ মেগাপাসকেল চাপের পরীক্ষা সফল হয়েছে। এর মধ্যে শনিবার দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালানও দেশে পৌঁছেছে।
এমন সময়ে প্রকল্পের ব্যয়, নিরাপত্তা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, জনবল ও কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ও নেতিবাচক প্রচারণা সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিনিয়র পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ ড. জাহেদুল হাসান।
সোমবার (৫ অক্টোবর) এসব বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে গঠনমূলক সমালোচনা ও জবাবদিহি গুরুত্বপূর্ণ। তবে অসম্পূর্ণ তথ্য বা প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হলে প্রকল্পের প্রশাসনিক কাঠামো ও বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
ড. জাহেদুল হাসানের ভাষ্য, রূপপুর প্রকল্পের শুরু থেকেই পারমাণবিক নিরাপত্তা, ব্যয় এবং কর্মকর্তা-প্রকৌশলীদের ভূমিকা নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক কিছু প্রচারণায় প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে যথাযথ পার্থক্য করা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
একাধিক পদে বেতন নেওয়ার অভিযোগ
ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকার অভিযোগের বিষয়ে এনপিসিবিএল এমডি বলেন, প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে তাঁকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে জুন ২০২৫ থেকে তিনি এনপিসিবিএলের পূর্ণকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং এ পদের জন্য নির্ধারিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন।
একই সময়ে একাধিক পদের জন্য পৃথক বেতন নেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয় দাবি করে তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পরিচালনা পর্ষদ, সংশ্লিষ্ট কমিটি ও ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়।
জনবল ও প্রশিক্ষণ
জনবল নিয়েও প্রচারিত বিভিন্ন তথ্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এনপিসিবিএলে মোট ১ হাজার ৯২২ জন নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৯৯৭ জন বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মধ্যে ২৭ জন প্রতিষ্ঠান ছেড়েছেন, যা মোট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবলের প্রায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ। ড. জাহেদুলের দাবি, গ্রেড ১৬ থেকে ১৯-এর প্রায় ১০০ কর্মীর প্রতিষ্ঠানত্যাগকে বিশেষায়িত পারমাণবিক জনবলের প্রস্থান হিসেবে দেখানো ঠিক নয়।
তাঁর মতে, ওই কর্মীদের মধ্যে অ্যাটেনডেন্ট, টেকনিশিয়ানসহ বিভিন্ন পদে থাকা কর্মীরাও ছিলেন। ফলে মোট কর্মীপ্রস্থান এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবলের প্রতিষ্ঠানত্যাগকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
উচ্চতর পদে দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া
শপ ম্যানেজার ও ডেপুটি শপ ম্যানেজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন এনপিসিবিএল এমডি।
তিনি বলেন, এসব পদে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত ক্ষমতাপ্রাপ্ত বোর্ড কমিটি নেয়। ব্যবস্থাপনা পরিচালক এককভাবে কাউকে নিয়োগ বা দায়িত্ব দিতে পারেন না। তাই বিদ্যমান কর্মীদের উচ্চতর দায়িত্ব দেওয়াকে ব্যক্তিগত নিয়োগ বা একক সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কমিশনিংয়ের দায়িত্ব কার
রূপপুরের কমিশনিং কার্যক্রম নিয়ে ড. জাহেদুল বলেন, প্রকল্পটির মালিক বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি), আর এনপিসিবিএল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অপারেটিং অর্গানাইজেশন।
তাঁর বক্তব্য, কমিশনিং-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, কার্যক্রম কিংবা কোনো বিলম্বকে সরাসরি এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যথাযথ নয়। এ ক্ষেত্রে প্রকল্পের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও দায়িত্বের বিভাজন বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
রাশিয়ায় কর্মকর্তাদের আবাসন নিয়ে ব্যাখ্যা
রাশিয়ায় কর্মকর্তাদের জন্য অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়ার বিষয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন এনপিসিবিএল এমডি। তিনি দাবি করেন, এটি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে করা হয়নি।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে নেওয়া প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে রাশিয়ায় অবস্থানরত পরিদর্শকদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়। ভাড়া ও অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করে প্রকল্পের জেনারেল কন্ট্রাক্টর জেএসসি এটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট (এএসই)।
তিনি জানান, বিভিন্ন সময়ে মোট ৪১ জন কর্মকর্তা এসব অ্যাপার্টমেন্টে অবস্থান করেছেন এবং তাঁদের জন্য সরকারি আদেশ (জিও) জারি করা হয়েছিল। একই সময়ে তাঁরা হোটেল ভাতা নেননি বলেও দাবি করেন তিনি।
৭৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার
বাসা ভাড়ার ৭৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগকে অমূলক ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন ড. জাহেদুল হাসান।
তিনি বলেন, অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও অর্থ পরিশোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এবং পরবর্তী অডিট বিবেচনা না করে এর দায় ব্যক্তিগতভাবে তাঁর ওপর চাপানো তথ্যগতভাবে সঠিক নয়।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিষয়টি পরবর্তীতে ছয় সদস্যের একটি অভ্যন্তরীণ অডিট দলের মাধ্যমে পরিদর্শন করা হয়। দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব। বাংলাদেশ দূতাবাসের রাশিয়ায় দায়িত্ব পালনরত দুই কর্মকর্তাও এতে অংশ নেন। পরে অডিট প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হয় বলে জানান তিনি।
তথ্য যাচাইয়ের আহ্বান
রূপপুর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রকল্প উল্লেখ করে ড. জাহেদুল হাসান বলেন, এ ধরনের প্রকল্প নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে অফিস আদেশ, পরিচালনা পর্ষদ ও কমিটির সিদ্ধান্ত, সরকারি আদেশ, অডিট প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, রূপপুর এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ অবস্থায় প্রকল্পটির নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল, কমিশনিং এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে তথ্যভিত্তিক আলোচনা ও স্বচ্ছতা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকল্পের বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে এনপিসিবিএল এমডির বক্তব্য তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যা হিসেবে এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, অডিট প্রতিবেদন ও অন্যান্য পক্ষের বক্তব্য যাচাই গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।


