মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা, দুশ্চিন্তায় জেলেরা
রাজবাড়ীতে ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে মা ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের অভিযান। এ সময় পদ্মা নদীতে সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে এই নিষেধাজ্ঞা জরুরি হলেও নদীতে নামা বন্ধ থাকায় সংসারের খরচ কীভাবে চালাবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন পদ্মাপাড়ের জেলেরা।
জেলেদের অভিযোগ, বছরের পর বছর নদীতে মাছ ধরলেও তাদের অনেকের জেলে কার্ড হয়নি। আবার মাছ ধরার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন—এমন ব্যক্তিরাও কার্ড পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রকৃত জেলেরা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
রাজবাড়ী জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রাজবাড়ী সদর, পাংশা, কালুখালী ও গোয়ালন্দ উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৪ হাজার ১০২ জন। এর মধ্যে ইলিশ শিকারের সঙ্গে জড়িত কার্ডধারী জেলে রয়েছেন ৬ হাজার ৩০৪ জন। তবে এবার ভিজিএফের চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ৫৯২ জনের জন্য। ফলে কার্ডধারী ৭১২ জন ইলিশ জেলে এ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সরেজমিনে রাজবাড়ী সদর উপজেলার বরাট, মিজানপুর ও গোয়ালন্দের দৌলতদিয়ার পদ্মাপাড়ে দেখা যায়, নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে নৌকা ও জাল মেরামতে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলেরা। কেউ জাল ঠিক করছেন, কেউ নৌকায় আলকাতরা দিচ্ছেন।
বরাটের জেলে জমির হালদার জানান, প্রায় পাঁচ-ছয় বছর ধরে নদীতে মাছ ধরলেও এখনো তার জেলে কার্ড হয়নি। পরিবারের সদস্য পাঁচ থেকে সাতজন। নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন কীভাবে সংসার চালাবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। মাছ ধরা ছাড়া অন্য কোনো কাজের সুযোগ না থাকায় পেটের দায়ে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও নদীতে নামতে হতে পারে বলে জানান তিনি।
মিজানপুরের জেলে ইয়াকুব আলীর জেলে কার্ড রয়েছে। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় নদীতে যাবেন না। তবে সরকারের দেওয়া ২৫ কেজি চাল দিয়ে বড় পরিবারের খরচ চালানো কঠিন।
দৌলতদিয়ার জেলে শুকচান হালদার প্রায় আট বছর ধরে নদীতে মাছ ধরলেও তার জেলে কার্ড হয়নি। তার ভাষ্য, তিনি কোনো চাল বা সরকারি সহায়তাও পান না। একই অভিযোগ ধাওয়াপাড়ার জেলে ইদ্রিস ব্যাপারীর।
প্রায় তিন যুগ ধরে মাছ ধরা সোহেল হালদার বলেন, পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হলে তারা নদীতে নামা থেকে বিরত থাকবেন।
রাজবাড়ী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুব উল হক বলেন, মা ইলিশের প্রজননের জন্য ২২ দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় ইলিশকে নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়া গেলে উৎপাদন বাড়বে। নিষেধাজ্ঞা সফল করতে জেলে ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
জেলে কার্ড নিয়ে অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতি বছর জেলে কার্ড হালনাগাদ করা হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নতুন জেলেদেরও যাচাই-বাছাই শেষে প্রকৃত জেলে হিসেবে শনাক্ত হলে কার্ড দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পাশাপাশি প্রকৃত জেলেদের তালিকা সঠিকভাবে হালনাগাদ, পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের নদীতে নামার প্রবণতা কমানোর পাশাপাশি ইলিশের প্রজননও নির্বিঘ্ন করা সম্ভব হবে।


