৭৫ বছর আগে এ দিনেই যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ ছাত্র হিযবুল্লাহ
মানব সমাজে আদর্শ, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার বিকাশে সংগঠনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ছাত্রসমাজকে আদর্শবান, জ্ঞানসমৃদ্ধ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আদর্শভিত্তিক ছাত্র সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যে জাতির ছাত্রসমাজ সুসংগঠিত ও আদর্শনিষ্ঠ, সেই জাতিই ভবিষ্যতে উন্নতি ও মর্যাদার শিখরে আরোহণ করতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশে ইসলামি আদর্শভিত্তিক ছাত্র আন্দোলনের ধারায় বাংলাদেশ ছাত্র হিযবুল্লাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আদর্শে অনুপ্রাণিত এ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ছাত্রসমাজকে ঈমান, ইলম, আদব ও আমলের সমন্বয়ে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা ও নির্ভরশীলতার মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে ঐক্য ও শক্তি। প্রতিকূলতা মোকাবিলায় সংঘবদ্ধ শক্তির বিকল্প নেই। ইসলামও মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ জীবনযাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। এ আদর্শ থেকেই ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ ছাত্র হিযবুল্লাহ আত্মপ্রকাশ করে।
বাংলাদেশ ছাত্র হিযবুল্লাহ কেবল একটি সংগঠনের নাম নয়; এটি একটি আদর্শিক আন্দোলন। নবীজি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শকে সামনে রেখে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে সংগঠনটি কাজ করে যাচ্ছে। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আদর্শবান ছাত্রসমাজ গড়ে তোলাই এর মূল উদ্দেশ্য।
বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের সূচনালগ্নে মুজাদ্দিদে মিল্লাত শাহসূফি হযরত মাওলানা নেছারুদ্দীন আহমদ (রহ.) পথভোলা ও আদর্শহারা ছাত্রসমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করার লক্ষ্যে একটি ছাত্র সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৩ সালে ছারছীনা শরীফে ‘আঞ্জুমানে আল ইসলাহ’ নামে একটি ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়।
পরবর্তীতে ১৯৫১ সালের ১১ মার্চ স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার ছাত্রদের এক সাধারণ সম্মেলনে সংগঠনটির নামকরণ করা হয় ‘জমিয়তে তোলাবায়ে হিযবুল্লাহ’। তখন এর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন পীর নেছারুদ্দীন আহমদ (রহ.)।
তার ইন্তেকালের পর তাঁর উত্তরসূরি পীর আবু জাফর মুহাম্মদ সালেহ (রহ.) সংগঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে সংগঠনটি বাংলাদেশ ছাত্র হিযবুল্লাহ নামে নতুনভাবে কার্যক্রম শুরু করে এবং দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এর কার্যক্রম বিস্তৃত হয়।
১৯৯০ সালে পীর আবু জাফর মুহাম্মদ সালেহ (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর সংগঠনের পৃষ্ঠপোষক হন বাহরে শরীয়ত শাহ মুহাম্মদ মোহেব্বুল্লাহ (রহ.)। তাঁর নেতৃত্বে সংগঠনটি তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইসলামি চেতনার প্রচার চালায়।
২০২৪ সালে তাঁর ইন্তেকালের পর বর্তমানে সংগঠনের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন দরবারের বর্তমান পীর শাহ আবু নছর নেছারুদ্দীন আহমদ হুসাইন (মা.জি.)।
বাংলাদেশ ছাত্র হিযবুল্লাহ একটি আদর্শিক সংগঠন। এর মূল লক্ষ্য হলো—হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শে ব্যক্তি, সমাজ ও দেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন।
বাংলাদেশ ছাত্র হিযবুল্লাহ সাতটি মূলনীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। এগুলো হলো—
১. লিল্লাহিয়াত — আল্লাহভিত্তিক জীবনযাপন
২. একামতে দীন — জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামের বিধান বাস্তবায়ন
৩. তাহছীলে ইলমে দীন — প্রয়োজনীয় ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন
৪. সোহবতে সালেহীন — নেককার আলেমদের সান্নিধ্য লাভ
৫. তাবলীগে দীন — ইসলামের দাওয়াত প্রচার
৬. জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ — দ্বীনের প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা
৭. ইতিছাম বি হাবলিল্লাহ — দ্বীনের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ জীবনযাপন
বাংলাদেশ ছাত্র হিযবুল্লাহ নিজেকে একটি অরাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন হিসেবে পরিচয় দেয়। তবে ইসলামি শাসনব্যবস্থার আদর্শকে তারা সমর্থন করে। সংগঠনটির মতে, প্রকৃত ইসলামি শাসনব্যবস্থা হলো খেলাফত ব্যবস্থা, যা আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তাই সংগঠনটি সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সংশোধনের মাধ্যমে ইসলামি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার পক্ষে কাজ করে।
ছাত্রসমাজ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাতা। আদর্শিক শিক্ষা, নৈতিকতা এবং ইসলামী মূল্যবোধে সমৃদ্ধ ছাত্রসমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ছাত্র হিযবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। সংগঠনটির মতে, আদর্শবান ও আল্লাহভীরু ছাত্রসমাজ গড়ে তুলতে পারলেই সমাজের অবক্ষয় দূর করা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।


