অসুস্থ রোগীর সেবায় করণীয়!
সুস্থতা মহান আল্লাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। মানুষ যখন সুস্থ থাকে, তখন অনেক সময় এই নিয়ামতের প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করতে পারে না। কিন্তু অসুস্থতা দেখা দিলে তখনই বোঝা যায়, সুস্থ জীবন কত বড় সম্পদ।
বর্তমান ব্যস্ত জীবনে আমরা অনেকেই পরিবার, কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত ব্যস্ততায় এমনভাবে ডুবে আছি যে, ঘরের অসুস্থ ও বয়োবৃদ্ধ মা-বাবার সেবা-যত্ন করার সময়ও বের করতে পারি না। আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশীর অসুস্থতার খবর নেওয়ার সুযোগও অনেক সময় হয়ে ওঠে না। এর ফলে অবহেলা ও অযত্নে অনেক মানুষের করুণ পরিণতির খবর প্রায়ই আমাদের কানে আসে।
ইসলাম অসুস্থ মানুষের সেবা, খোঁজখবর নেওয়া এবং তাকে দেখতে যাওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এটি শুধু মানবিক দায়িত্বই নয়, বরং ইবাদত এবং সাওয়াব অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“এমন দুটি নিয়ামত আছে, যাতে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়— সুস্থতা এবং অবসর।”
(সহিহ বুখারি: ৬৪১২)
এই হাদিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সুস্থতা ও অবসর—উভয়ই মহান আল্লাহর অমূল্য দান। অথচ আমরা অনেক সময় এ দুটির যথাযথ মূল্যায়ন করি না।
রোগীর সেবা-যত্ন ও খোঁজখবর নেওয়ার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছেন। হজরত বারা ইবনে আজেব (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের রোগী দেখতে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়ার ফজিলত এতটাই বেশি যে, শুধু সাক্ষাৎ করতেই একজন মুসলমান বিপুল সাওয়াব লাভ করেন।
হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“কোনো মুসলমান তার অসুস্থ মুসলিম ভাইকে দেখতে গেলে, সে বসা পর্যন্ত জান্নাতের ফল আহরণ করতে থাকে। এরপর বসলে আল্লাহর রহমত তাকে আচ্ছাদিত করে। যদি সকালে দেখতে যায়, তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য দোয়া করতে থাকে। আর সন্ধ্যায় গেলে সকাল পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য দোয়া করতে থাকে।”
(ইবনে মাজাহ: ১৪৪২, আবু দাউদ: ৩০৯৮, মুসনাদে আহমদ: ৭৫৬)
অন্য এক হাদিসে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“কোনো ব্যক্তি রোগী দেখতে গেলে একজন ফেরেশতা ঘোষণা করেন—তুমি উত্তম কাজ করেছ, তোমার পথ কল্যাণময় হোক এবং তুমি জান্নাতে একটি বাসস্থান অর্জন করলে।”
(ইবনে মাজাহ: ১৪৪৩)
অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কথাও হাদিসে এসেছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা বলবেন,
“হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ ছিলাম, তুমি আমাকে দেখতে আসোনি।”
বান্দা বলবে, “হে আমার রব! আপনি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক, আমি কীভাবে আপনাকে দেখতে যেতাম?”
তখন আল্লাহ বলবেন,
“তুমি কি জানতে না, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ ছিল? তুমি যদি তাকে দেখতে যেতে, তাহলে আমাকে তার কাছেই পেতে।”
(সহিহ মুসলিম: ২৫৬৯)
বাস্তবে অসুস্থ মানুষ অনেক সময় ওষুধের পাশাপাশি প্রিয়জনের সান্নিধ্য, আন্তরিক খোঁজখবর ও সান্ত্বনামূলক কথাবার্তা থেকেও মানসিক শক্তি লাভ করেন। একটি আন্তরিক সাক্ষাৎ, একটি দোয়া কিংবা কিছু সময় পাশে থাকা—এসব অনেক সময় অর্থ-সম্পদের চেয়েও মূল্যবান হয়ে ওঠে।
তাই আমাদের উচিত অসুস্থ মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধু, সহকর্মী কিংবা পরিচিত যে কোনো মানুষের খোঁজ নেওয়া, প্রয়োজনে তাকে দেখতে যাওয়া এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সেবা-যত্ন ও সহযোগিতা করা। এতে যেমন একজন অসুস্থ মানুষ মানসিকভাবে সাহস পান, তেমনি আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালের উত্তম প্রতিদান লাভের আশা করতে পারি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর, তাদের সেবা-যত্ন করার এবং মানবিক দায়িত্ব পালনের তাওফিক দান করুন। আমিন।


