অমূলক সন্দেহ যেভাবে মানুষকে পাপের পথে ঠেলে দেয়
মানুষের প্রতি অকারণে সন্দেহ পোষণ করা ইসলামে নিন্দনীয় কাজ। কোনো প্রমাণ বা যথাযথ কারণ ছাড়াই অন্যের প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা থেকে শুরু হয় অবিশ্বাস, ঘৃণা ও শত্রুতা। অনেক সময় এই সন্দেহের বশবর্তী হয়ে মানুষ অন্যের ক্ষতি করতেও দ্বিধা করে না। অথচ যার বিরুদ্ধে সন্দেহ করা হচ্ছে, তিনি হয়তো বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানেন না। এভাবে অমূলক ধারণা একপর্যায়ে মিথ্যাচার, অপবাদ ও অন্যায়ের জন্ম দেয়।
এ বিষয়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা মন্দ ধারণা পোষণ করা থেকে দূরে থাকো। কেননা মন্দ ধারণা হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১৯৮৮)। অর্থাৎ যথাযথ প্রমাণ ছাড়া কারও সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা করা কিংবা সেই ধারণার ভিত্তিতে তার সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী।
বর্তমান সমাজে নানা ধরনের অনিয়ম, অস্থিরতা ও পাপাচারের মধ্যে নিজের ইমান ও আমল ঠিক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মুসলমানের উচিত এমন সব কাজ ও পরিস্থিতি থেকে দূরে থাকা, যা অন্যের মনে অযথা সন্দেহের সৃষ্টি করতে পারে। কথাবার্তা, আচার-আচরণ, চলাফেরা ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা প্রয়োজন। এতে যেমন নিজের দ্বীন ও নৈতিকতা সুরক্ষিত থাকে, তেমনি রক্ষা পায় ব্যক্তিগত সম্মান ও মর্যাদা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সন্দেহপূর্ণ বিষয়কে পরিহার করে চলে, বস্তুত সে তার দ্বীন ও সম্ভ্রমকেই বাঁচিয়ে রাখে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৯)। অন্যদিকে, নিজের এমন কোনো আচরণ করা উচিত নয়, যার কারণে অযথা অপমান বা অসম্মানের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে, ‘নিজেকে অপদস্থ করা কোনো মুমিনের জন্য বৈধ নয়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪০১৬)।
সন্দেহ এড়িয়ে চলার পাশাপাশি নিজের আচরণে স্বচ্ছতা বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছেন মহানবী (সা.) নিজেই। আলি ইবনে হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে বলা হয়েছে, রমজানের শেষ দশকে রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে ইতিকাফে ছিলেন। এ সময় তাঁর স্ত্রী হজরত সাফিয়া (রা.) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। কিছুক্ষণ কথা বলার পর তিনি ফিরে যেতে উদ্যত হলে রাসুল (সা.) তাঁকে বিদায় জানাতে সঙ্গে এগিয়ে যান।
মসজিদের দরজার কাছে পৌঁছালে দুজন সাহাবি তাঁদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সালাম দেন। তখন তিনি সাহাবিদের উদ্দেশে বলেন, ‘একটু দাঁড়াও, এ হচ্ছে সাফিয়া বিনতে হুয়াই।’ সাহাবিরা বিস্ময় প্রকাশ করলে তিনি ব্যাখ্যা করেন, শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরায় চলাচল করে। তাই তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, শয়তান যেন তাঁদের মনে কোনো সন্দেহ সৃষ্টি না করে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৩৫)।
এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, সন্দেহের অবকাশ তৈরি হতে পারে—এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার গুরুত্ব কতটা। কারণ, অনেক সময় মানুষের অস্পষ্ট কথা, অসংযত আচরণ কিংবা অনুপযুক্ত সঙ্গ অন্যের মনে ভুল ধারণার জন্ম দেয়। সেই ধারণা থেকে শুরু হতে পারে পরনিন্দা, অপবাদ ও গিবত। অথচ ইসলাম এসব কাজ থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা বহু ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। কেননা কিছু কিছু ধারণা গুনাহ। পরস্পরের দোষ তালাশ করো না, একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি এটা পছন্দ করে যে, সে তার মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করবে? বস্তুত তোমরা তা অপছন্দ করো। নিঃসন্দেহে আল্লাহতায়ালাই তওবা কবুলকারী ও পরম করুণাময়।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২)।
এ আয়াতে অমূলক সন্দেহ, অন্যের গোপন দোষ অনুসন্ধান এবং গিবত থেকে বিরত থাকার সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সততা, সংযম ও সহনশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো অন্যকে পাপের দিকে ঠেলে দেওয়া নয়, বরং ভালো ও কল্যাণকর কাজে সহযোগিতা করা।
এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা পরস্পরকে পুণ্য ও খোদাভীতির কাজে সাহায্য করো, পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সাহায্য করো না।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ২)।
ব্যক্তির আচরণের প্রভাব শুধু তার নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; অনেক সময় পরিবার, বংশ, গোষ্ঠী কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্মানও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। একজনের অসংযত আচরণের কারণে অন্য কেউ অপমানিত বা সমালোচিত হতে পারেন। তাই কথা ও কাজে এমন সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন, যাতে অন্যের জন্য অন্যায় বা অপমানজনক পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আল্লাহর পরিবর্তে তারা যেসব উপাস্যের উপাসনা করে তোমরা তাদের গালমন্দ করো না, অন্যথায় তারা না জেনে আল্লাহতায়ালার প্রতিও গালমন্দ করবে।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১০৮)।
এ আয়াতের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে রাসুলুল্লাহ (সা.) পিতা-মাতাকে গালি দেওয়ার বিষয়েও সতর্ক করেছেন। সাহাবিরা জানতে চেয়েছিলেন, কোনো ব্যক্তি কীভাবে নিজের পিতা-মাতাকে গালি দিতে পারে? উত্তরে তিনি বলেন, একজন অন্য ব্যক্তির পিতা-মাতাকে গালি দেয়, ফলে প্রতিশোধ হিসেবে অপর ব্যক্তিও তার পিতা-মাতাকে গালি দেয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯০)।
অর্থাৎ নিজের আচরণের মাধ্যমে অন্যকে অন্যায় কাজে প্ররোচিত করাও নিন্দনীয়। তাই একজন মুমিনের উচিত নিজের কথা ও কাজের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং এমন কোনো আচরণ না করা, যা অন্যের পাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সবশেষে বলা যায়, অমূলক সন্দেহ মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নষ্ট করার পাশাপাশি সমাজে অবিশ্বাস, বিদ্বেষ ও বিশৃঙ্খলা বাড়ায়। ইসলাম তাই প্রমাণ ছাড়া নেতিবাচক ধারণা পোষণ, অন্যের দোষ অনুসন্ধান ও গিবত থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দিয়েছে। নিজের সম্মান রক্ষা করা, অন্যের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা এবং পুণ্য ও সদাচারে সহযোগিতা করাই একজন মুমিনের কর্তব্য। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সন্দেহ, অপবাদ ও সব ধরনের পাপাচার থেকে মুক্ত থাকার তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: ইমাম ও খতিব


