অন্যের দোষ ও গোপন বিষয় প্রকাশে ইসলামের নিষেধাজ্ঞা
মানুষের জীবনে কিছু ব্যক্তিগত ও গোপনীয় বিষয় থাকে, যা সে অন্যের সামনে প্রকাশ করতে চায় না। প্রত্যেকেই চায়, তার ভুলত্রুটি ও ব্যক্তিগত দুর্বলতাগুলো যেন গোপন থাকে। তাই অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ানো এবং তা মানুষের কাছে প্রকাশ করা নিন্দনীয় স্বভাব। ইসলামে এ ধরনের আচরণ কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা একে অন্যের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না।’ (সুরা হুজরাত: ১২)।
সামাজিকতা, চক্ষুলজ্জা ও অপমানের ভয় অনেক সময় মানুষকে অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। ভুল বুঝতে পেরে কেউ একসময় আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে পারে এবং নিজেকে সংশোধন করতে পারে। কিন্তু তার অপরাধ জনসমক্ষে প্রকাশ করে দিলে অনেক সময় সেই অনুশোচনা ও লজ্জাবোধ হারিয়ে যেতে পারে। তখন কেউ কেউ ভাবতে পারে, যা হওয়ার হয়ে গেছে, সবাই তো জেনেই গেছে। ফলে পাপের প্রতি ভয় কমে গিয়ে প্রকাশ্যে অন্যায় করার প্রবণতা বাড়তে পারে। এভাবে সমাজে পাপ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
অন্যের দোষ প্রকাশ না করার বিষয়ে পবিত্র কোরআনে আরও বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ কোনো মন্দ বিষয় প্রকাশ করা পছন্দ করেন না। তবে কারও প্রতি জুলুম হয়ে থাকলে সে কথা আলাদা। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্ব বিষয়ে জ্ঞাত।’ (সুরা নিসা: ১৪৮)।
এ বিষয়ে সাহাবিদের জীবনেও শিক্ষণীয় ঘটনা রয়েছে। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) এক রাতে ইবনে মাসউদ (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে বাইরে বের হন। এক জায়গায় আগুনের আলো দেখতে পেয়ে তাঁরা সেদিকে এগিয়ে যান। একপর্যায়ে একটি ঘরের সামনে পৌঁছালে ইবনে মাসউদ (রা.)-কে বাইরে রেখে ওমর (রা.) ভেতরে প্রবেশ করেন।
ঘরে গিয়ে তিনি দেখেন, এক বৃদ্ধ বসে আছেন। তাঁর সামনে পান করার মতো কিছু রাখা এবং এক দাসী তাঁকে গান শোনাচ্ছেন। দৃশ্যটি দেখে ওমর (রা.) অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তখন বৃদ্ধ লোকটি তাঁকে বলেন, তিনি যা দেখেছেন তা ঠিক; কিন্তু অনুমতি ছাড়া অন্যের ঘরে প্রবেশ করে দোষ খুঁজে বেড়ানোও গুরুতর অন্যায়। কারণ, আল্লাহ অন্যের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করতে নিষেধ করেছেন।
বৃদ্ধের কথা শুনে ওমর (রা.) নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং সেখান থেকে চলে যান। দীর্ঘদিন পর ওই বৃদ্ধকে নিজের দরবারে দেখে তিনি তাঁকে কাছে ডাকেন। বৃদ্ধ লোকটি ভেবেছিলেন, সেদিনের ঘটনার জন্য হয়তো তাঁকে শাস্তি দেওয়া হবে। কিন্তু ওমর (রা.) তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলেন, সেদিন রাতে তিনি যা দেখেছিলেন, তা কাউকে জানাননি। এমনকি তাঁর সঙ্গে থাকা ইবনে মাসউদ (রা.)-কেও বলেননি।
জবাবে বৃদ্ধ লোকটিও জানান, তিনি সেই কাজ আর কখনো করেননি। এ কথা শুনে ওমর (রা.) আনন্দে তাকবির দেন। ঘটনাটি থেকে বোঝা যায়, অন্যের গোপন পাপ প্রকাশ না করে তা আড়াল করে রাখার মধ্যে সংশোধনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। (হায়াতুস সাহাবা: ২/৫৩৮৮)।
এ ঘটনা থেকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। প্রথমত, অন্যের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়ানো যাবে না। অনিচ্ছাকৃতভাবে কারও কোনো গোপন ভুল চোখে পড়লেও তা অযথা প্রকাশ করা উচিত নয়। দ্বিতীয়ত, কারও ঘরে প্রবেশের আগে অবশ্যই তার অনুমতি নিতে হবে।
মানুষের নিজের জীবনেও এমন অনেক ভুল থাকতে পারে, যা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। তাই নিজের গোপনীয়তা ও ভুলত্রুটি আড়ালে রাখতে চাইলে অন্যের গোপন বিষয়ও সম্মানের সঙ্গে গোপন রাখা উচিত।
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন করে রাখবে, মহান আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও পরকালে তার দোষ গোপন করে রাখবেন।’ (মুসলিম: ৬৪৭২)।
অন্যের দোষ অনুসন্ধান ও প্রকাশ করার পরিণতি সম্পর্কেও সতর্ক করেছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যের দোষ খুঁজে ফেরে, আল্লাহ তায়ালা তার দোষ উন্মোচন করে দেন। আর শুনে রাখো, আল্লাহ তায়ালা কারও দোষ উন্মোচন করলে, সে যেখানেই থাকুক তার নিস্তার নেই, অবশ্যই সে লাঞ্ছিত হবে।’ (আবু দাউদ: ৪৮৮০)।
ইমাম নববী (রহ.)-এর বক্তব্যেও মানুষের দোষ অনুসন্ধান ও তা প্রকাশ করার প্রবণতার নিন্দা করা হয়েছে। তাই নিজের ভুল আড়াল করতে অন্যের দোষ প্রকাশ করা কিংবা কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে তার ব্যক্তিগত বিষয় ছড়িয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকা জরুরি।
নিজের গোপন পাপ অন্যের কাছে প্রকাশ করার বিষয়েও ইসলামে সতর্ক করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের সবার গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। কিন্তু নিজেরা নিজেদের দোষত্রুটি জাহিরকারীদের পাপ ক্ষমা করা হবে না।’ এরপর তিনি এমন ব্যক্তির উদাহরণ দেন, যে রাতে কোনো পাপ করে এবং আল্লাহ তা গোপন রাখেন; কিন্তু সকালে নিজেই অন্যের কাছে সেই পাপের কথা প্রকাশ করে বেড়ায়। (বুখারি: ৬০৬৯)।
এই হাদিসের শিক্ষা হলো, আল্লাহ যে অপরাধ গোপন রেখেছেন, তা অযথা মানুষের কাছে প্রকাশ করে বেড়ানো উচিত নয়। একইভাবে অন্যের গোপন ভুলত্রুটিও মানুষের সামনে তুলে ধরে তাকে অপমান করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
তবে অন্যায়ের শিকার হলে ন্যায়বিচার চাওয়া বা প্রয়োজনীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানোর বিষয়টি আলাদা। ইসলামে অন্যের গোপনীয়তা রক্ষার শিক্ষা অন্যায় ও জুলুমের বিচার চাওয়ার পথে বাধা নয়।
সুতরাং অন্যের দোষ অনুসন্ধান, তা প্রচার কিংবা নিজের গোপন পাপ নিয়ে অহেতুক গর্ব করার প্রবণতা থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। মহান আল্লাহ আমাদের নিজেদের ভুল সংশোধন করার এবং অন্যের গোপনীয়তা রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।


