আইএমএফের আপত্তি সত্ত্বেও পে স্কেল বাস্তবায়নের পথে সরকার

জাতীয়
আইএমএফের আপত্তি সত্ত্বেও পে স্কেল বাস্তবায়নের পথে সরকার
৪ আগস্ট ২০২৬

বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেলের গেজেট শিগগিরই প্রকাশ হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানিয়েছেন, নতুন বেতন কাঠামোর কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন মিললেই প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া শুরু হবে।

তবে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে আর্থিক সক্ষমতা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অন্তত দুই বছর পে স্কেল বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিলেও সরকার তা গ্রহণ করছে না। বরং অক্টোবরে আইএমএফের বার্ষিক সভার আগেই গেজেট প্রকাশ করে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের প্রস্তুতি চলছে বলে অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।

এক যুগ ধরে নেই নতুন পে স্কেল

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ অষ্টম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হয় ২০১৫ সালে। এরপর প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হলেও নতুন কোনো বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়নি।

এ সময়ে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও নিত্যপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন পে স্কেলের দাবি জোরালো হয়।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে নবম জাতীয় পে কমিশন সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।

এতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। প্রস্তাবে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছিল।

তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২১ এপ্রিল পৃথক একটি কমিটি গঠন করে পে স্কেলের পুরো বিষয়টি পুনরায় পর্যালোচনা শুরু করে। ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

অতীতের পে স্কেলে কত বেড়েছিল বেতন

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত আটবার জাতীয় পে স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রতিটি পে স্কেলেই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বিভিন্ন হারে বাড়ানো হয়েছে।
১৯৭৩ সালের প্রথম পে স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ছিল ১৩০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা। ১৯৭৭ সালের দ্বিতীয় পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ৭৩ শতাংশ বেড়ে ২২৫ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৫০ শতাংশ বেড়ে ৩ হাজার টাকা হয়।

১৯৮৫ সালের তৃতীয় পে স্কেলে সবচেয়ে বড় বেতন বৃদ্ধি দেখা যায়। এ সময় সর্বনিম্ন মূল বেতন ১২২ শতাংশের বেশি বেড়ে ৫০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন দ্বিগুণ হয়ে ৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।

১৯৯১ সালের চতুর্থ পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ৮০ শতাংশ বেড়ে ৯০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন প্রায় ৬৭ শতাংশ বেড়ে ১০ হাজার টাকা হয়।

১৯৯৭ সালের পঞ্চম পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন প্রায় ৬৭ শতাংশ বেড়ে দেড় হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৫০ শতাংশ বেড়ে ১৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।

২০০৫ সালের ষষ্ঠ পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ৬০ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৪০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৫৩ শতাংশ বেড়ে ২৩ হাজার টাকা হয়।

২০০৯ সালের সপ্তম পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ৪ হাজার ১০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।

সর্বশেষ ২০১৫ সালের অষ্টম পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ১০১ শতাংশ বেড়ে ৮ হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৯৫ শতাংশ বেড়ে ৭৮ হাজার টাকায় উন্নীত হয়।

বাস্তবায়নে বড় আর্থিক চাপ

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন পে স্কেলের আওতায় প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কয়েক লাখ পেনশনভোগী আসবেন। মূল বেতনের পাশাপাশি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, উৎসব ভাতা ও পেনশন ব্যয়ও বাড়বে।

অর্থনীতিবিদদের ধারণা, নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে সরকারের বছরে অতিরিক্ত ব্যয় অন্তত ৮২ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। ফলে অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দিতে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় আরো দক্ষতা প্রয়োজন হবে।

আইএমএফের আপত্তি, সরকারের ভিন্ন অবস্থান

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে সরকারের রাজস্ব ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই আইএমএফ অন্তত দুই বছর পে স্কেল বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। সংস্থাটির মতে, এতে বাজেট ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।

তবে সরকার আইএমএফের এই পরামর্শ গ্রহণ করেনি। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নতুন পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব, বাজেট সক্ষমতা ও বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত বহাল রেখে প্রয়োজনে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়নের বিষয়ে কাজ করার নির্দেশনা দেন।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বলেছেন, নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে আইএমএফের ঋণের কোনো সম্পর্ক নেই। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারি করতে বেশি সময় লাগবে না।

শিগগিরই মন্ত্রিসভায় উঠতে পারে প্রস্তাব

সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নবম জাতীয় পে স্কেলের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হতে পারে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন মিললে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পথ খুলবে।

তবে পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং রাজস্ব আয়ের ওপর এর প্রভাব বড় বিষয় হয়ে থাকবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এক যুগ পর সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার।