রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা ও ‘ভুয়া’ স্লোগান অত্যন্ত দুঃখজনক
রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা ও অশালীন শব্দ ব্যবহার করে চিৎকারের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)। তিনি বলেছেন, বক্তব্য চলাকালে ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে চিৎকার করা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের পরিবেশ ও শালীনতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভা’য় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বক্তব্য দেওয়ার সময় কেউ “ভুয়া ভুয়া” বলে চিৎকার করে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে কি এগুলো মানায়? কবে আমরা শিখব? যাই হোক, অত্যন্ত দুঃখজনক।’
অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত সরকারি ডকুমেন্টারিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছবি না থাকার অভিযোগকে কেন্দ্র করে হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।
বিদেশি অতিথিদের সামনে এমন আচরণকে অনভিপ্রেত উল্লেখ করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আজকের দৃশ্যটি একেবারেই অনভিপ্রেত ছিল। ভুলত্রুটি তো মানুষের হবেই। সেটি আমরা সবাই মিলে শুধরে নেব। কোনো কিছুই তো নিখুঁত নয়। কিন্তু বিদেশি অতিথিদের সামনে যেভাবে নাস্তানাবুদ হতে হলো, তা আমাকে খুবই ব্যথিত করেছে।’
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান—উভয় আন্দোলনই দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে সংঘটিত হয়েছিল।
গণতন্ত্রকে হেলাফেলার বিষয় নয় উল্লেখ করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশে যতদিন গণতন্ত্র ও সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, ততদিন দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন থাকবে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এত অন্যায়, অবিচার, খুন, গুম, অর্থপাচার, হত্যা, নির্যাতন, আয়নাঘর—এসবের পরও তাদের কোনো লজ্জাবোধ নেই। আবার বলে ডিসেম্বরে দেশে এসে পদার্পণ করবে। আমরা অপেক্ষা করে আছি, আসেন দেশে।’
নিজের মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক সংগ্রামের কথা স্মরণ করে ৮২ বছর বয়সী হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘২৭ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। এখন ৮২ বছর বয়সে বাংলাদেশের জন্য আরেকটা করব। বাংলাদেশের জনগণের শাসন ও গণতন্ত্র চিরস্থায়ী করে যাব।’
তিনি বলেন, ‘আমরা রক্ত দিয়েছি এই দেশের জন্য। ১৯৭১ সালে যুদ্ধে আহত হয়েছিলাম। এ ধরনের বাংলাদেশ দেখার জন্য নয়।’
জুলাইয়ের বীরত্বগাথা স্মরণ করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ, জুলাইয়ের ইতিহাস গৌরবের ইতিহাস। পৃথিবীতে অনেক রাষ্ট্র আছে, কিন্তু তাদের এমন নাগরিক নেই। উদ্ধত সঙিনের সামনে আবু সাঈদের মতো দুই হাত তুলে দাঁড়ানোর সাহস কোনো জাতির আছে? আমরা সেই জাতি। তাদের নিয়ে আমরা গর্ববোধ করি।’
জুলাই যোদ্ধাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা যারা এখানে এসেছেন, মন খারাপ করবেন না। যারা ১৯৭১ সালে জীবন দিয়েছেন, তারাও কিছু পাননি। আপনারাও হয়তো পাবেন না, তবে এই সরকারের কাছ থেকে নিশ্চয়ই সম্মান পাবেন।’
সরকারের অগ্রাধিকার তুলে ধরে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মত্যাগকারী শহীদদের পরিবারের দেখভাল করা সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো জুলাইয়ে যারা আত্মাহুতি দিয়েছেন, তাদের পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ করা। এটাই সবচেয়ে পবিত্র দায়িত্ব।’
আহত জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, যারা চোখের দৃষ্টি বা শরীরের অঙ্গ হারিয়েছেন, তাদের সুস্থ করে তোলা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি বড় সুযোগ এনে দিয়েছে উল্লেখ করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, দেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা—যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ও মর্যাদা ভোগ করবে।
তিনি বলেন, ‘আজ আমরা নতুন যাত্রার সূচনাপর্বে দাঁড়িয়ে আছি। এ যাত্রাপথ সহজ নয়। মতের ভিন্নতা থাকবে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমাদের ঐক্য, সংযম ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে।’
অনুষ্ঠানে ঘটে যাওয়া বিশৃঙ্খলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আজকের এ ঘটনায় সবচেয়ে খুশি হবেন যিনি পাশের দেশে বসে আছেন। তার জন্য এটি অত্যন্ত আনন্দের একটি দিন।’
সরকারের সমর্থকদের ধৈর্য ধারণের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যাদের জনগণের সামনে দাঁড়ানোর শক্তি নেই, যাদের সেই অতীত নেই, জনকল্যাণ যাদের চিন্তায় নেই, তারা নানান ধরনের তত্ত্বের সমাবেশ ঘটাবে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে সব কথা বলা ঠিক নয়। ঐক্য বিনষ্ট হয়, এমন কোনো কথা বলতে চাই না।’
সংবর্ধনা ও আলোচনা সভায় জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য, জুলাই যোদ্ধা এবং সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন।


