বাংলাদেশকে সঠিক উপায়ে ‘ব্র্যান্ডিং’ করার চেষ্টা করছি: শামা ওবায়েদ

জাতীয়
বাংলাদেশকে সঠিক উপায়ে ‘ব্র্যান্ডিং’ করার চেষ্টা করছি: শামা ওবায়েদ
৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশনে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও উন্নয়নের সুযোগ বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ পররাষ্ট্রনীতির আওতায় বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক, আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘আসন্ন জাতিসংঘ সম্মেলন ও বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশি এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

শামা ওবায়েদ বলেন, এবারের ইউএনজিএ বাংলাদেশের জন্য নতুন যাত্রা, সম্ভাবনা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। নতুন গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিচ্ছেন।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

আগামী ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন শুরু হবে। এতে দারিদ্র্য বিমোচন, জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি প্রতিরোধ, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ও টেকসই উন্নয়নসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে।

এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের জন্য বাড়তি গুরুত্বের কারণ হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনের বিষয়টি তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিদেশে বাংলাদেশের ৮৩টি মিশনের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসার কারণেই এই কূটনৈতিক সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের ভূমিকার কথাও তুলে ধরে শামা ওবায়েদ বলেন, বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ মিশনগুলোতে নারীসহ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সাহস, সহনশীলতা ও আত্মত্যাগের কারণে জাতিসংঘে বাংলাদেশের একটি বিশেষ সম্মানজনক অবস্থান রয়েছে।

অর্থনৈতিক কূটনীতিতে গুরুত্ব

অর্থনৈতিক কূটনীতিকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারী ও প্রবাসীদের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কাজ চলছে।

বিনিয়োগকারীদের ওয়ান-স্টপ সেবা দিতে ‘বাংলাদেশ ইনভেস্ট’ ফ্রেমওয়ার্ক চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি কোম্পানি নিবন্ধনসহ বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল সুবিধা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

নাগরিকদের সব তথ্য একটি একক ডেটাবেজের আওতায় আনতে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড’ উদ্যোগের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। প্রবাসী বাংলাদেশিদের সেবা সহজ করতে ২০২৭ সালের মধ্যে ২ লাখ ‘প্রবাসী কার্ড’ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের বিনিয়োগের সুযোগ, ঐতিহ্য, পর্যটন, সৃজনশীল শিল্প ও রপ্তানিযোগ্য পণ্যের প্রচারে প্রবাসীদের নিজস্ব নেটওয়ার্ক ব্যবহারের আহ্বান জানান শামা ওবায়েদ।

অভিবাসন ও ভিসা নীতিতে পরিবর্তন

অনিয়মিত অভিবাসন ও মানব পাচারকারী চক্রের কর্মকাণ্ড বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে বলে মন্তব্য করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পৃথক ‘মাইগ্রেশন উইং’ চালু করা হয়েছে। অবৈধ অভিবাসন, প্রবাসীদের সমস্যা ও অভিবাসন-সংক্রান্ত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই শাখা কাজ করবে।

বৈধ পথে দক্ষ শ্রমিকদের বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়াতে পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বেশি—এমন জেলাগুলো চিহ্নিত করে গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ব্যবসা, পর্যটন, কর্মসংস্থান ও অন-অ্যারাইভাল ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করতে ভিসা নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশকে আরও অতিথিপরায়ণ ও বিনিয়োগবান্ধব করে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। একই সঙ্গে বিমানবন্দর সেবা ও পর্যটন খাত সংস্কারের কাজ চলছে।

জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণের উদ্যোগ

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একক কোনো বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, অতিরিক্ত এলএনজি উৎসের পাশাপাশি আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতার সম্ভাবনাও যাচাই করছে সরকার।

এ ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ইতোমধ্যে শতভাগ সৌরবিদ্যুতের আওতায় এসেছে এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

রপ্তানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে সৃজনশীল অর্থনীতি, নারী নেতৃত্বাধীন উদ্যোগ, ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলা, মসলিন, কুটির শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।

প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটকে পরিবেশবান্ধব পণ্য হিসেবে তুলে ধরে শামা ওবায়েদ বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পাট ও পাটজাত পণ্যের প্রচারণা চালাবে বাংলাদেশ। তুরস্কে অনুষ্ঠেয় আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনেও পাটকে টেকসই প্রাকৃতিক আঁশ হিসেবে তুলে ধরতে একটি স্টল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

ইউএনজিএতে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিশেষ অধিবেশন

রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও ইউএনজিএ চলাকালে বিশেষ অধিবেশন আয়োজনের কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেবেন।

তিনি বলেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ, আরাকান আর্মি, আঞ্চলিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্বার্থের সংঘাতের কারণে রোহিঙ্গা সংকট দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান কঠিন হবে।

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে প্রবাসী বাংলাদেশি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

‘বাংলাদেশকে নতুনভাবে ব্র্যান্ডিং করতে হবে’

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে শুধু বন্যা, দুর্যোগ কিংবা অনিয়মিত অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর দেশ হিসেবে উপস্থাপন না করার আহ্বান জানিয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, পর্যটন, ব্যবসা ও বিনিয়োগে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশকে সঠিকভাবে ব্র্যান্ডিং করতে সরকার কাজ করছে। তবে এই উদ্যোগ সফল করতে নাগরিক, ব্যবসায়ী, সুশীল সমাজ ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে সেন্টার ফর নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশির চেয়ারম্যান এম এস সেকিল চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের ইতিবাচক উন্নয়ন তুলে ধরতে তাদের বার্ষিক ‘ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স সিরিজ’-এর অংশ হিসেবে এ আয়োজন করা হয়েছে। বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগ ও বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করাও এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।