ফ্যাসিবাদী শক্তি প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
সংসদ অধিবেশনে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
সরকারি ও বিরোধীদলের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক, দ্বিমত ও বহুমত থাকলেও ‘ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ’ প্রতিরোধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেমের ১৪৭ বিধিতে উত্থাপিত সাধারণ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ আহ্বান জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংসদে সরকারি ও বিরোধীদলের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তবে আওয়ামী লীগের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘সরকারিদল, বিরোধীদল সবাই মিলে আমাদের একটাই অঙ্গীকার হবে, প্রতিশ্রুতি হবে। আমরা এখানেই বিতর্ক করবো, তর্ক করবো, দ্বিমত হবো, বহুমত হবো। কিন্তু ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের প্রশ্ন যেখানেই আসবে, তা প্রতিরোধের জন্য আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ।’
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গণতন্ত্রের পক্ষে এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যে দৃঢ় ঐক্য গড়ে উঠেছিল, সেটিকে শক্তিতে পরিণত করে গণতন্ত্রের পক্ষে সবাইকে কাজ করতে হবে।
পলাতক আসামিদের ফেরাতে অগ্রগতি
বিদেশে অবস্থানরত পলাতক আসামিদের শনাক্ত, গ্রেপ্তার ও দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকারের সাম্প্রতিক কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, হত্যা মামলায় অভিযুক্ত, গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত ও ইন্টারপোলের রেড নোটিশভুক্ত মোহাম্মদ আরিফ সরকারকে গত ৬ মে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এবং মোবারক মণ্ডলকে ২৭ মে কাতার থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
কুমিল্লার তনু হত্যা মামলার পলাতক অভিযুক্ত মো. জাহিদুজ্জামান ও মো. শাহিন আলমকে শনাক্ত করতে তাদের বিরুদ্ধে পৃথক রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। অবস্থান শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বেনজীরকে ফেরাতে আইনি প্রক্রিয়া
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদসহ বিদেশে অবস্থানরত কোনো পলাতক আসামিকে আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে সরকার শৈথিল্য দেখাবে না বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, বেনজীরের বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত করা, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া, কথিত একাধিক পাসপোর্টের অভিযোগ যাচাই এবং দেশে-বিদেশে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ শনাক্ত ও আইনানুগভাবে জব্দ করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
বেনজীরকে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে মীর আহমাদ বিন কাসেমের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এক দেশ থেকে আরেক দেশে গিয়ে কাউকে সরাসরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
তিনি বলেন, ইউএই থেকে আসামি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে পারস্পরিক আইনি সহায়তা বা এমএলএ প্রক্রিয়া রয়েছে। সরকার-টু-সরকার এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-টু-পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আগে দুবাই সফর করেছেন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার গুরুত্বও তাদের জানানো হয়েছে।
বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্ব
বিদেশে পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কোনো অপরাধী যত বড় অপরাধই করুক না কেন, তাকে বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নিতে হবে।
তিনি বলেন, কাউকে ধরে এনে সরাসরি শাস্তি দেওয়া যায় না। আদালতের রায় অনুযায়ী আইন বাস্তবায়ন করতে হয়। এ প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হলেও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে ধৈর্য ধরতে হবে।
গুম প্রতিরোধ আইন নিয়েও বক্তব্য
সংসদে গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকারসংক্রান্ত আইন নিয়ে বিরোধীদলের বক্তব্যের জবাবও দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট আইন নিয়ে বিরোধীদলের সদস্যরা আপত্তি ও সংশোধনী দিতে পারতেন। তবে তারা সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় ওয়াকআউট করেছেন।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগের অধ্যাদেশের তুলনায় বর্তমান আইনে ভুক্তভোগীদের সরাসরি আদালত ও আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রাখার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ থেকে ‘এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স’ বা গুম শব্দটি চিরতরে মুছে ফেলা সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রত্যাশা এবং জাতির প্রত্যাশা অনুযায়ী সরকার এ বিষয়ে আইন করেছে।
সংসদে বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যে ঐক্য তৈরি হয়েছিল, সেটিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।


