সংবিধান সংস্কারে লংমার্চ নয়, বিরোধীদের আলোচনায় বসার আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

রাজনীতি
সংবিধান সংস্কারে লংমার্চ নয়, বিরোধীদের আলোচনায় বসার আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
৩১ অক্টোবর ২০২৬

সংবিধান সংস্কার নিয়ে রাজপথে লংমার্চ না করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষের ক্ষমতা, কার্যপরিধি ও এখতিয়ার কী হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। এ জন্য বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আলোচনায় অংশ নিতে হবে। লংমার্চ করে এসব বিষয়ে সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট ও বাকশাল’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, উচ্চকক্ষ পিআর (আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতিতে গঠিত হলে এর ক্ষমতা, কর্মপরিধি ও এখতিয়ার কী হবে, তা আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আসার আহ্বান জানান তিনি।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

তিনি বলেন, যেসব বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া হয়েছে, সেগুলোতে পরিবর্তন বা সমঝোতা আনতে হলে আলোচনা প্রয়োজন। লংমার্চের মাধ্যমে এসব বিষয়ে সমাধান সম্ভব নয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠন করা গেলে সেটিকে কী ধরনের ক্ষমতা দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। উচ্চকক্ষ অনির্বাচিত হলে নির্বাচিত সিনেটের মতো ক্ষমতা দেওয়া যাবে কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয়।

উচ্চকক্ষের সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নজরুল সাহেব একটি প্রস্তাব দিয়েছেন—উচ্চকক্ষের সদস্যদের গাড়ি, বাড়ি, বেতন-ভাতা না দেওয়ার। এ প্রস্তাবের সঙ্গে তিনি একমত।

উচ্চকক্ষে আইন আটকে থাকার সময়সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব

উচ্চকক্ষের কারণে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, নিম্নকক্ষে পাস হওয়া আইন পর্যালোচনা বা অনুমোদনের জন্য উচ্চকক্ষে পাঠানো হলে কত দিন সেটি সেখানে রাখা যাবে এবং কত দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে, তা নির্ধারণ করা জরুরি। অন্যথায় সংসদীয় ব্যবস্থায় আইন প্রণয়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হতে পারে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সমস্যা দেখা দিতে পারে।

তিনি আরও বলেন, সংবিধানের কোন কোন সংশোধনী উচ্চকক্ষে যাবে, সেগুলো কত সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হবে এবং কত দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে—এসব বিষয় আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বা ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ ধারণার প্রকৃত অর্থ ও পরিধি নিয়েও আলোচনা হওয়া দরকার। এ ধরনের কোনো ধারা বা সংশোধনী উচ্চকক্ষে গেলে তার পরিণতি কী হবে, সেটিও স্পষ্ট করতে হবে।

আদেশ দিয়ে সংবিধান পরিবর্তন নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা

সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিরোধী দলের দাবির প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান সংস্কারের জন্য একটি আদেশ জারি করা হয়েছিল। তবে এভাবে আদেশের মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে তাঁর প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘তারা চাইলেন সংবিধান সংস্কার করতে হবে। আমার ভাই (আসিফ নজরুল) একটি আদেশ পাস করে দিয়েছিলেন। এখন কি তা অস্বীকার করব? সেই আদেশ পাস না করার জন্য আমি তখন অনুরোধ করেছিলাম। রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও কথা বলেছি। এভাবে আদেশ দিয়ে সংবিধানকে স্পর্শ করা যায় কি না, সেটি প্রশ্ন।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান প্রণীত হওয়ার আগে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও বিভিন্ন প্রেসিডেন্ট অর্ডারের মাধ্যমে অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেগুলো নোটিফিকেশনের মাধ্যমে কার্যকর করা হয়। তবে সংবিধান সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, সব রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলে আলাদা করে আদেশ জারির প্রয়োজন হয় না। সমঝোতার দলিলে স্বাক্ষরের মাধ্যমে পক্ষগুলো অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। কেউ সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে পরবর্তী সংসদে তাকে রাজনৈতিকভাবে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।

তিন জোটের সমঝোতা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা

তিন জোটের রাজনৈতিক সমঝোতা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ওই সমঝোতার অনেক বিষয় লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে তিন জোটের বিষয়ে লিখিত কোনো দলিল এখনো পাওয়া যায়নি। সমঝোতার অন্যতম বিষয় ছিল সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠা, যা বাস্তবায়িত হয়েছে।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্বায়ত্তশাসনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা বেড়েছে। তবে সরকারের হাতে একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান থাকা প্রয়োজন কি না, সে প্রশ্নও রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার কেন বিটিভিকে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে যায়নি, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বেসরকারি চ্যানেল ও গণমাধ্যমের বিস্তারের কারণে এখন পরিস্থিতি বদলেছে। তবে ভারসাম্য ও জবাবদিহি বজায় রাখতে সরকারের কিছু প্রতিষ্ঠান থাকা প্রয়োজন। বৃহত্তর অর্থে রাজনৈতিক সমঝোতার অনেক বিষয় বাস্তবায়িত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুরুতে বিএনপি এ ব্যবস্থা মেনে নিতে চায়নি। কিন্তু পরে যখন এটি জনদাবিতে পরিণত হয়, তখন দলটি তা মেনে নেয়।

ক্ষমতার পাশাপাশি জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা কেবল সংবিধান সংশোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলে মন্তব্য করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার পাশাপাশি সেগুলোর ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান নির্মাণের পাশাপাশি সেই প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইনের মাধ্যমে জবাবদিহির ব্যবস্থা রাখতে হবে। তা না হলে কোনো প্রতিষ্ঠানই ভবিষ্যতে স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিরোধিতা কেউ করছেন না। তবে বিচারকদের স্বাধীনতার পাশাপাশি তাঁদের জবাবদিহি আছে কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

বিচারক নিয়োগের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, বিচার বিভাগের বিভিন্ন পদে নিয়োগের যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের উদ্দেশে তিনি বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ প্রসঙ্গে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের একটি বক্তব্যও উল্লেখ করেন তিনি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায়। তাঁর দাবি, বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে বিচারকরা যথেষ্ট স্বাধীন এবং এ ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা সীমিত। বিচার বিভাগের বিভিন্ন সাংবিধানিক বিধান ও নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত বিষয় নিয়েও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে সংসদ

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিয়ে বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্রের কোনো একটি অঙ্গের আলাদা সার্বভৌমত্ব থাকতে পারে না। সার্বভৌমত্বের মূল ভিত্তি জনগণ ও দেশ।

তিনি বলেন, জনগণ সরাসরি সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ না করে নির্বাচনের মাধ্যমে আইনসভার সদস্যদের নির্বাচিত করেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদে জনগণের সেই সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। এ কারণেই বাস্তবিক অর্থে বলা হয়, সংসদ সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে। রাষ্ট্রের অন্য অঙ্গগুলো সরাসরি নির্বাচিত নয়।