ক্ষুব্ধ ভোটারের কড়া জবাব: যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প যুগের অবসানের সূচনা

ক্ষুব্ধ ভোটারের কড়া জবাব: যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প যুগের অবসানের সূচনা
৪ নভেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় ব্যবধানের জয় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দলটির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোতেও সমর্থন কমে যাওয়ার ঘটনা ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

নির্বাচনী ফলাফলে ভোটারদের অসন্তোষের পেছনে কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া এবং ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়ম ও ব্যবসায়িক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ।

‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বুধবার সকাল পর্যন্ত প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে জাতীয় পর্যায়ে মোট ভোটের হিসাবে ডেমোক্র্যাটরা প্রায় ১৩ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন। ১৯৭৬ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস নির্বাচনে কোনো দলের জন্য এটিকে সর্বোচ্চ ব্যবধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

এই ব্যবধান ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটন এবং ২০১০ সালে বারাক ওবামার প্রেসিডেন্সির সময় রিপাবলিকানদের ঐতিহাসিক জয়ের ব্যবধানকেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ‘জেরিম্যান্ডারিং’-এর কারণে জাতীয় পর্যায়ে ভোটের এই ব্যবধান আসনসংখ্যায় একইভাবে প্রতিফলিত নাও হতে পারে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের হোয়াইট হাউসের রাজনৈতিক পরিচালক ডগলাস বি. সসনিকের মতে, এই ফলাফল ট্রাম্প, রিপাবলিকান পার্টি এবং গত দুই বছরে তাদের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ভোটারদের স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান। তাঁর ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র আগামী দুই বছর একটি অস্থির রাজনৈতিক রূপান্তরপর্বের মধ্য দিয়ে যেতে পারে।

তবে পরাজয়ের দায় নিজের ওপর নিতে রাজি নন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, তিনি সরাসরি নির্বাচনে প্রার্থী না থাকায় রিপাবলিকানরা প্রত্যাশিত ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে পারেনি। মঙ্গলবার রাতে ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তিনি ব্যালটে না থাকায় দল পর্যাপ্ত ভোট পায়নি।

ট্রাম্পের এই ব্যাখ্যা অবশ্য দলের ভেতরেও সবাই গ্রহণ করছেন না। কারণ, পুরো নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব ছিল। প্রার্থী বাছাই থেকে শুরু করে প্রচারণার বিষয়বস্তু, কৌশল ও বক্তব্য নির্ধারণ—সব ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে টেক্সাস ও সাউথ ক্যারোলাইনার মতো রিপাবলিকান-প্রধান অঙ্গরাজ্যে ট্রাম্পের পছন্দের দুই সিনেট প্রার্থীর পরাজয় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো করেছে।

নির্বাচনের আগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নতুন যুদ্ধে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু পরবর্তী সময়ে শুল্কনীতি, করসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে বলে সমালোচকদের অভিযোগ। এতে সাধারণ ভোটারদের একাংশ নিজেদের প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল খুঁজে পাননি।

নির্বাচনের আগের দিন ট্রাম্পের বক্তব্যেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের চেয়ে বড় উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ভোটারদের দৈনন্দিন সমস্যা থেকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের এই দূরত্বও পরাজয়ের অন্যতম কারণ হতে পারে।

ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে—ট্রাম্পের রাজনৈতিক জোট কি দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হয়ে পড়ছে, নাকি এই ফলাফল সাময়িক জনঅসন্তোষের প্রতিফলন? বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা মাগা সমর্থকগোষ্ঠী এখনো পুরোপুরি বিলীন হয়নি। তবে নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্পের বাকি মেয়াদে রাজনৈতিক চাপ ও বিরোধিতার মাত্রা বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস