অবৈধ জালে ক্ষতিগ্রস্ত নদী, সংকটে ভোলার জেলে পরিবার
ভোলার নদ-নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে ৩০-৩৫ শতাংশ জেলে এখনো অবৈধ বা নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করছেন। অথচ এদের ৯৩ শতাংশ জানেন না, এসব জাল ব্যবহারে মাছের পোনা, প্রজনন ক্ষেত্র ও জলজ জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তাদের দাবি—জীবিকার তাগিদেই তারা কারেন্ট জাল, মশারি, ঠেলা বা বিন্দি জালের মতো নিষিদ্ধ উপকরণ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে যেমন মাছের পোনা নির্বিচারে মারা যাচ্ছে, তেমনি নদী হারাচ্ছে স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র।
এ তথ্য উঠে এসেছে কোস্ট ফাউন্ডেশনের ২০২৪–২৫ সালের গবেষণায়। সোমবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য প্রকাশ করে সংস্থাটি।
গবেষণায় দেখা গেছে, দারিদ্র্য ও ঋণ নির্ভরতার কারণেই অধিকাংশ জেলে অবৈধ উপায়ে মাছ ধরতে বাধ্য হন।
৬৫ শতাংশ পরিবার ঋণ শোধে দাদনের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
৮৭ শতাংশ জেলে পরিবার কখনও কোনো প্রশিক্ষণ বা বিকল্প আয় উপকরণ পাননি।
মাত্র ৫ শতাংশ পরিবার বিকল্প কোনো পেশায় যুক্ত হতে পেরেছেন।
ফলে নিষেধাজ্ঞার মৌসুমে তাদের আয় প্রায় ১০–১৫ হাজার টাকা থেকে নেমে আসে শূন্যের কোঠায়। এই আর্থিক ধস পরিবারে কলহ, সহিংসতা ও হতাশার জন্ম দেয়। গবেষণা অনুযায়ী, নারীর ওপর সহিংসতা বেড়েছে ৩০–৪০ শতাংশ পর্যন্ত।
ভোলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার। এর মধ্যে ৮১ হাজার পরিবার এখনো কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা পান না।
সরকারি তথ্যের বাইরে এখনো ২০ হাজারের বেশি জেলে পরিবার রয়েছে বলে দাবি করেছে কোস্ট।
ভোলা সদরেই ২৫ হাজার জেলে পরিবারের মধ্যে মাত্র ৫৫ শতাংশের হাতে রয়েছে জেলে কার্ড।
নিষেধাজ্ঞাকালে সরকারি সহায়তা পায় মাত্র ৪৪ শতাংশ কার্ডধারী।
সব মিলিয়ে সহায়তা প্রাপ্তির হার ২৪ শতাংশের নিচে।
এছাড়া ৮৩ শতাংশ পরিবার জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার ১–২ মাস পরে সহায়তার চাল হাতে পেয়েছেন।
অবৈধ জাল ব্যবহারে শুধু মাছ নয়, হারিয়ে যাচ্ছে পোনার খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত শৈবাল ও অতিক্ষুদ্র জলজ প্রজাতি। এর ফলে মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। তবে নিষিদ্ধ জাল উৎপাদন বন্ধে কার্যকর তদারকি নেই।
ক্ষুদ্র জেলেদের টেকসই উন্নয়ন ও জীবিকা সুরক্ষায় কোস্ট ফাউন্ডেশন নিচের ৯ দফা দাবি জানিয়েছে:
প্রকৃত জেলেদের তালিকা প্রকাশ ও নিবন্ধন নিশ্চিত করা।
নিষেধাজ্ঞাকালে পরিবারপ্রতি মাসে ৮,০০০ টাকা নগদ ও ৪০ কেজি চাল বরাদ্দ।
সহায়তা পৌঁছাতে হবে নিষেধাজ্ঞার ১৫ দিন আগে, চালু করতে হবে ডিজিটাল ট্র্যাকিং।
প্রাতিষ্ঠানিক লোন সহজ করতে ব্যাংক/এনজিও পর্যায়ে প্রক্রিয়া তৈরি।
নারী ও তরুণদের জন্য বিকল্প আয়মুখী প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সহায়তা।
ঋণ নির্ভরতা কমাতে প্রণোদনা ও স্বল্পসুদে সমবায়ী লোনের ব্যবস্থা।
নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও নজরদারি বাড়ানো।
আন্তর্জাতিক নীতিমালায় ক্ষুদ্র জেলেদের অন্তর্ভুক্তি এবং ‘Just Transition Fund’ গঠন।
মান্দা সম্প্রদায়কে অতিসত্বর জেলে কার্ডের আওতায় আনা।
এদিকে ৩ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলছে মা ইলিশের প্রজনন মৌসুম। এ সময়ে ইলিশ ধরায় রয়েছে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু সহায়তার ঘাটতি ও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষুদ্র জেলেরা পড়ছেন চরম সংকটে।


