চুল পড়া ঠেকাতে পেঁয়াজ, মেথি বা কালো জিরার তেল কি সত্যি কার্যকরী?

স্বাস্থ্য
চুল পড়া ঠেকাতে পেঁয়াজ, মেথি বা কালো জিরার তেল কি সত্যি কার্যকরী?
১৬ আগস্ট ২০২৬

চুল মানুষের সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই অতিরিক্ত চুল পড়া নিয়ে নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই উদ্বেগ দেখা যায়। আর এই উদ্বেগকে কাজে লাগিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের তেল, হেয়ার প্যাক ও ঘরোয়া উপাদানের চটকদার প্রচারণাও বেড়েছে।

ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মেথি, কালোজিরা, পেঁয়াজের রস, কারিপাতা, জবা ফুল কিংবা আমলকী দিয়ে তৈরি পণ্যকে ‘অর্গানিক’ বা ‘প্রাকৃতিক সমাধান’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। অনেক বিজ্ঞাপনে শতভাগ চুল পড়া বন্ধ কিংবা নতুন চুল গজানোর নিশ্চয়তাও দেওয়া হচ্ছে। তবে এসব দাবির কতটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

প্রাকৃতিক উপাদানেই কি চুল গজায়?

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

জবা ফুল, পেঁয়াজ, মেথি, কালোজিরা ও আমলকীর মতো বিভিন্ন উপাদানে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান রয়েছে। এগুলো স্কাল্পের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য কিছুটা উপকারী হতে পারে।

তবে এসব উপাদান সরাসরি মাথায় ব্যবহার করলেই চুল পড়া বন্ধ হবে কিংবা নতুন চুল গজাবে—এমন শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

নর্দার্ন ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডার্মাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তাসনীম খাঁন বলেন, বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান নিয়ে পরীক্ষাগারে বা প্রাণীর ওপর কিছু গবেষণায় ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলেও মানুষের ক্ষেত্রে কার্যকারিতার পক্ষে পর্যাপ্ত শক্তিশালী প্রমাণ নেই। তবে রোজমেরি তেল ব্যবহারে কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল পাওয়ার তথ্য রয়েছে।

প্রতিদিন চুল পড়া কি স্বাভাবিক?

চুল পড়া সবসময় রোগের লক্ষণ নয়। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ১০০টি চুল ঝরে পড়া স্বাভাবিক।

স্ট্রেস, হরমোনের পরিবর্তন, পুষ্টির ঘাটতি, বিভিন্ন অসুস্থতা কিংবা স্কাল্পের সংক্রমণের কারণে সাময়িকভাবে চুল পড়ার পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। কারণ চিহ্নিত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

অন্যদিকে বংশগতভাবে চুল পাতলা হওয়া বা পুরুষ ও নারীদের প্যাটার্ন হেয়ার লস দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ঘরোয়া তেল বা হেয়ার প্যাক দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

মাথায় মাখা নাকি খাবারে গুরুত্ব?

চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে শরীরে পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। আমলকী, পেঁয়াজ, অ্যালোভেরাসহ বিভিন্ন খাবারে থাকা ভিটামিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান শরীরের জন্য প্রয়োজনীয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি থাকলে খাবারের মাধ্যমে তা পূরণ করা চুলের স্বাস্থ্যের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মাথায় কোনো খাবার বা উপাদান মাখলেই তার সব পুষ্টিগুণ চুলের গোড়ায় পৌঁছে যাবে—এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

উদাহরণ হিসেবে ডিমের কথা বলা যায়। ডিমে থাকা প্রোটিন শরীরের জন্য উপকারী হলেও মাথায় ডিম মাখলেই চুলের গোড়ায় সেই পুষ্টি সরাসরি পৌঁছে যাবে, এমন প্রমাণ নেই।

অতিরিক্ত তেলও হতে পারে সমস্যা

চুল পড়া বন্ধের আশায় অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করাও সবসময় উপকারী নয়। বিশেষ করে যাদের স্কাল্প তৈলাক্ত, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তেল ব্যবহারে খুশকি বা স্কাল্পের অন্যান্য সমস্যা বাড়তে পারে।

অন্যদিকে শুষ্ক ও কোঁকড়া চুলে তেল কন্ডিশনারের মতো কাজ করতে পারে। তবে চুলের ধরন ও স্কাল্পের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে তেল ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ভিন্ন হতে পারে।

চটকদার বিজ্ঞাপনে নয়, কারণ খুঁজুন

বিশেষজ্ঞদের মতে, চুল পড়ার কারণ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপন দেখে কোনো ‘ম্যাজিক’ তেল বা হেয়ার প্যাক ব্যবহারের আগে সতর্ক হওয়া জরুরি।

অনলাইনে বিক্রি হওয়া পণ্যের উপাদান, সংরক্ষণ পদ্ধতি ও মেয়াদ সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে ব্যবহার করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চুলের ফলিকল একবার স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবে সেখানে নতুন ফলিকল তৈরি হয় না। তাই অতিরিক্ত চুল পড়া শুরু হলে দীর্ঘদিন ঘরোয়া টোটকার ওপর নির্ভর না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পুষ্টি, চুল পড়ার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই চুলের স্বাস্থ্য রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর পথ