টাইম ম্যাগাজিনের বিশেষ প্রতিবেদন
‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে তারেক রহমান
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন শেষে দেশে ফিরেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ঢাকায় তার প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি তার রাজনৈতিক দর্শন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলন-পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়ে নিজের ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় পৌঁছালে বিমানবন্দর এলাকায় বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থক তারেক রহমানকে স্বাগত জানান। এর কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি হারান তার মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেও তিনি দেশ ও জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
টাইম-এর সাংবাদিক চার্লি ক্যাম্পবেলের সঙ্গে আলাপে তারেক রহমানকে আগের তুলনায় অনেক বেশি সংযত ও নীতিনির্ভর রাজনীতিবিদ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। দীর্ঘ সময় প্রবাসে থাকার অভিজ্ঞতা তাকে নীতি, অর্থনীতি ও ইতিহাসমনস্ক করে তুলেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তিনি এখন বক্তৃতার চেয়ে আলোচনাকে বেশি গুরুত্ব দেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরস্থির পন্থায় বিশ্বাসী।
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে তারেক রহমান নিজেকে একটি পরিবর্তনকালীন নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে দেখছেন। তার ভাষায়, তিনি একদিকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্তরাধিকার বহন করছেন, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকেও প্রতিনিধিত্ব করতে চান।
অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব মোকাবিলায় তিনি বাস্তবমুখী পরিকল্পনার কথা জানান। কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় ১২ হাজার মাইল খাল খনন, বছরে পাঁচ কোটি গাছ রোপণ এবং ঢাকায় নতুন সবুজ অঞ্চল তৈরির মতো উদ্যোগের কথা উঠে আসে সাক্ষাৎকারে। পাশাপাশি অভিবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও বলেন তিনি।
নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী তারেক রহমান বলেন, তার পরিকল্পনার একটি অংশ বাস্তবায়িত হলেই জনগণের আস্থা অর্জন সম্ভব। সাম্প্রতিক জরিপে বিএনপির প্রতি জনসমর্থনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, এসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই প্রমাণিত হয়নি। কারাবন্দি অবস্থায় নির্যাতনের ফলে শারীরিক জটিলতার কথাও তিনি তুলে ধরেন, যা তাকে আরও দায়িত্বশীল রাজনীতির দিকে ধাবিত করেছে বলে মন্তব্য করেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক জোরদার করা হবে এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে। তিনি মনে করেন, সাম্প্রতিক গণআন্দোলন একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতির বিপরীতে আইনের শাসনের ওপর জোর দেন। তার ভাষায়, অপরাধের বিচার হবে প্রচলিত আইনের আওতায়।
সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে জনপ্রিয় সিনেমার সংলাপ উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, “বিরাট ক্ষমতার সঙ্গে বিরাট দায়িত্বও আসে।” তার মতে, জনগণের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করাই হবে তার নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য।
টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘ নির্বাসনের মধ্য দিয়ে তারেক রহমান নিজেকে নতুনভাবে প্রস্তুত করেছেন। আগামী নির্বাচনই নির্ধারণ করবে, তিনি কতটা সফলভাবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন।


