ইরানের বিরুদ্ধে অস্ত্রের বদলে অর্থনৈতিক চাপ—কী হিসাব কষছে যুক্তরাষ্ট্র?
ইরানের ওপর সামরিক চাপের পাশাপাশি এবার অর্থনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে তেহরানকে বাধ্য করতে নিষেধাজ্ঞা, নৌ অবরোধ ও আর্থিক চাপ জোরদার করছে ওয়াশিংটন। তবে এর পেছনে শুধু ইরানের অর্থনীতি দুর্বল করার লক্ষ্য নয়, দীর্ঘদিনের সামরিক অভিযানে মার্কিন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও নির্ভুল গোলাবারুদের মজুতের ওপর তৈরি হওয়া চাপও ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন কিছু প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক।
যুক্তরাষ্ট্রের স্টিমসন সেন্টারের ন্যাশনাল সিকিউরিটি রিফর্ম প্রোগ্রামের পরিচালক ও সাবেক মার্কিন মেরিন কর্মকর্তা ড্যান গ্রেজিয়ার আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, হরমুজ খুলতে ইরানের ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ দেওয়া হলেও তেহরানের তা মোকাবিলার সক্ষমতা রয়েছে।

তার মতে, ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকেই বিভিন্ন মাত্রার মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে ইরান। কয়েক দশক ধরে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সামলে আসার অভিজ্ঞতা রয়েছে দেশটির। তাই নতুন করে চাপ বাড়ালেই ইরান দ্রুত নতি স্বীকার করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন: ফেসবুক– এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব
গ্রেজিয়ার আরও প্রশ্ন তুলেছেন, প্রায় ছয় মাসের সামরিক অভিযান যে লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, সেটি এখন অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে কতটা সফলভাবে অর্জন করা সম্ভব হবে।
অস্ত্রের মজুতেও চাপ?
বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, সামরিক অভিযান থেকে অর্থনৈতিক চাপের দিকে ওয়াশিংটনের ঝুঁকে পড়ার পেছনে মার্কিন অস্ত্রভান্ডারের ওপর তৈরি হওয়া চাপও একটি কারণ হতে পারে।
গ্রেজিয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রশাসন ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিলেও দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং নির্ভুল নির্দেশিত গোলাবারুদের সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ার বিষয়টি বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণে উঠে এসেছে।
ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানে দূরপাল্লার বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও স্ট্যান্ড-অফ অস্ত্রের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতা তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে অভিযান দীর্ঘায়িত হলে অস্ত্রের মজুত আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য সামরিক প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। ইউরোপ ও এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলার জন্য অস্ত্রের মজুত ধরে রাখা পেন্টাগনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে একটি যুদ্ধক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহার করা কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতির বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠন করছে। আগের প্রশাসনের সময়ে ইউক্রেনকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সরবরাহের কারণেই মজুত কমে গিয়েছিল বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
নৌ অবরোধ ও নতুন নিষেধাজ্ঞা
সামরিক অভিযানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর ইঙ্গিতও সাম্প্রতিক সময়ে স্পষ্ট হয়েছে। ১৩ আগস্ট মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ইরানের ওপর নৌ অবরোধ দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রয়েছে ওয়াশিংটনের।
একই সময়ে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে আরও অর্থনৈতিক চাপ ও নতুন নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন।
এর মাধ্যমে ইরানের তেল রপ্তানি ও বৈদেশিক আয় কমিয়ে তেহরানের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোই ওয়াশিংটনের অন্যতম লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা এই সরু জলপথ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।
ফলে দীর্ঘ সময় ধরে হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু ইরান নয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়া, সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হরমুজ ইরানের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার। প্রণালির আশপাশে ইরানের উপকূল ও দ্বীপগুলো থেকে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, মাইন ও ছোট নৌযানের মাধ্যমে জাহাজ চলাচলে হুমকি তৈরি করা সম্ভব।
ফলে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে একবার জলপথ খুলে দিলেই দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ হবে না।
অর্থনৈতিক যুদ্ধ কি সামরিক অভিযানের বিকল্প?
বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের সামনে বড় দুটি ঝুঁকি রয়েছে। সামরিক অভিযান চালিয়ে গেলে একদিকে অস্ত্রের মজুত ও যুদ্ধব্যয় বাড়বে, অন্যদিকে হরমুজে বড় ধরনের অভিযান চালালে ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের আরও বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এই বাস্তবতায় নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের মাধ্যমে ইরানের তেল আয় ও বৈদেশিক বাণিজ্যে চাপ সৃষ্টি করে সামরিক সংঘাতের বাইরে থেকেই তেহরানকে রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করলেও দেশটির সরকারকে নীতিগতভাবে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারেনি।
চীনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য, বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা এবং তেল বিক্রির নিজস্ব নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ইরান দীর্ঘস্থায়ী চাপ মোকাবিলার চেষ্টা করতে পারে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, ইরানের তেল আয় কমানো এবং তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরানো—এই তিনটি লক্ষ্যই মার্কিন অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানে অস্ত্রের মজুতের ওপর তৈরি হওয়া চাপও কৌশল পরিবর্তনের সম্ভাব্য একটি কারণ হতে পারে। তবে এটিকে এখনই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিবদলের একমাত্র বা নিশ্চিত কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

