ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারস্পরিক স্বার্থের ওপর জোর জয়শঙ্করের
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পারস্পরিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তার মতে, দুই দেশের সম্পর্ক তখনই কার্যকরভাবে এগোয়, যখন উভয় পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে একটি ‘অভিন্ন জায়গা’ বা সমঝোতার ক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব হয়।
ইকোনমিক টাইমস ওয়ার্ল্ড লিডার্স ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি জয়শঙ্কর। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের নীতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পারস্পরিক স্বার্থের ওপর জোর দেন তিনি।
জয়শঙ্কর বলেন, কোনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কার্যকর রাখতে হলে উভয় পক্ষের জন্যই তাতে কিছু সুবিধা থাকতে হবে। এক পক্ষ শুধু নিজের স্বার্থ অনুযায়ী অন্য পক্ষের কাছ থেকে সবকিছু আশা করতে পারে না। একইভাবে অপর পক্ষের স্বার্থকেও সম্মান করতে হবে।
তিনি বলেন, দুই দেশ যখন নিজেদের স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় করে একটি অভিন্ন জায়গায় পৌঁছাতে পারে, তখনই সম্পর্ক স্বাভাবিক ও মসৃণভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।
হাসিনার প্রত্যর্পণ ঘিরে টানাপোড়েন
জয়শঙ্করের এই বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন শেখ হাসিনাকে ঘিরে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে দিতে ভারতকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ। বিষয়টি দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। সফর নিয়ে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চললেও এখনো চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারিত হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে জয়শঙ্করের পারস্পরিক স্বার্থ ও ‘কমন গ্রাউন্ড’ খোঁজার বক্তব্যকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনায় ভারতের বৃহত্তর কূটনৈতিক অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে।
ঝুঁকি কমাতে বহুমুখী সম্পর্কের ওপর জোর
বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে সংঘাত, প্রতিযোগিতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ঝুঁকি কমানো বা ‘ডি-রিস্কিং’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তার মতে, কোনো একটি দেশ বা উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থেকে বিভিন্ন দেশ ও উৎসের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে সরবরাহব্যবস্থা বা অর্থনীতির কোনো একটি অংশে সংকট তৈরি হলেও সামগ্রিক ক্ষতি কমানো সম্ভব।
জ্বালানি, সার ও আন্তর্জাতিক নৌপথের বাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রসঙ্গ তুলে জয়শঙ্কর বলেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে শুধু কম খরচের বিষয়টি বিবেচনা করলেই হবে না; ভবিষ্যতের ঝুঁকিও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্কেও ভারসাম্যের বার্তা
চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়েও বক্তব্য দেন জয়শঙ্কর। তিনি বলেন, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সীমান্ত পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে ভারত ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি। বিশ্বের বড় অর্থনীতির দুই দেশ হিসেবে উভয় দেশেরই একে অপরের বাজারে ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে।
জয়শঙ্কর বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে যেমন ভারত ব্যবসা করবে, তেমনি চীনের সঙ্গেও করতে হবে। তবে এর পাশাপাশি নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো এবং আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।


