একই সপ্তাহে নিভে গেল দুই সন্তান, স্তব্ধ এক মা: ‘আমি এখন কী নিয়ে বাঁচবো?’
বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার সেই বিকেলে স্কুল গেটে অপেক্ষা করছিলেন এক মা—ঘর ফিরবেন দুই সন্তানকে নিয়ে। কিন্তু ভাগ্য ঠিক করেছিল অন্যকিছু। মুহূর্তেই আকাশ থেকে নেমে আসা আগুনের গোলায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল একটি পরিবারের সব স্বপ্ন।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ত নিঝুম (১৩) ও নাফি (৯)। স্কুল শেষ হলে ছোট ভাইকে দিয়ে বড় বোনকে আনতে বলেছিলেন মা। তারা আর ফেরেনি। ফিরেছে নিথর শরীর, পুড়ে যাওয়া শৈশব আর এক বুক কান্না নিয়ে।
নিহত দুই শিশুর মা চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন,
“একদিন আগে মেয়েটা চলে গেলো, পরদিন রাতে ছেলেটাও চলে গেলো। ডাক্তার বলছিল জানাবে, কিন্তু জানালো—ছেলেও মারা গেছে। এখন আমি কী নিয়ে বাঁচবো?”
সাবেক সেনাসদস্য আশরাফুল ইসলামের পরিবার স্বপ্ন দেখত উচ্চশিক্ষিত, মানবিক মানুষ গড়ার। সেই স্বপ্নের নাম ছিল—নাজিয়া তাবাসসুম নিঝুম ও আরিয়ান আশরাফ নাফি। মেয়েটির স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার, সাদা অ্যাপ্রোন পরে মানুষের সেবা করবে। সেই ইচ্ছেই তাকে আরেক দুনিয়ায় পৌঁছে দিল আগুনের আগুনে।
সোমবার দুপুরে বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয় মাইলস্টোন স্কুলের হায়দার আলী ভবনে। দগ্ধ অবস্থায় ঢামেক বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয় নিঝুম ও নাফিকে। রাত ৩টায় মারা যায় নিঝুম, আর ঠিক ২৪ ঘণ্টা পর ভাই নাফিও না ফেরার দেশে।
জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারির আবাসিক চিকিৎসক ডা. শাওন বিন রহমান জানান,
“নাজিয়ার শরীরের ৯০ শতাংশ ও নাফির ৯৫ শতাংশ দগ্ধ ছিল। চিকিৎসক হিসেবে আমাদের হৃদয়ও পুড়ে গেছে।”
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দুই ভাই-বোনকে পাশাপাশি কবর দেওয়া হয়েছে উত্তরায়। জানাজার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তাদের দাদা এ কে এম আলতাফ হোসেন মাস্টার। বলেন,
“১৫-১৬ বছর আগে থেকেই ঢাকায় এসেছিলাম ছেলেমেয়েকে বড় স্বপ্নে গড়ে তুলবো বলে। আজ সবকিছু শেষ।”
এই মর্মান্তিক ঘটনায় শুধু একটি পরিবার নয়, আহত হয়েছে গোটা সমাজচেতনা। উত্তরার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একমাত্র রানওয়েতে সামরিক প্রশিক্ষণ চলা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। দায় এড়াতে পারে না প্রশাসন কিংবা বিমানবাহিনী।
এ প্রশ্ন আজ শুধু নিঝুম ও নাফির পরিবারের নয়, পুরো দেশের মানুষের। যেন রাষ্ট্রের বুকে লেখা হলো—“আমরা নিরাপদ নই, স্কুলেও নয়।”


