আসন্ন ডাকসু নির্বাচন: উত্তাপ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
নানা নাটকীয়তা ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচন ঘিরে রাজধানীর সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ক্যাম্পাসে ফিরে এসেছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রায় ৩৮ হাজার ভোটার সরাসরি ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন।
এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে ১০টি প্যানেল এবং প্রায় ৫৮৬ জন কেন্দ্রীয় সংসদ প্রার্থী। তবে, বিশ্লেষকদের মতে, ইশতেহারগত দিক থেকে প্যানেলগুলোর মধ্যে বড় কোনো বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে না—ফলে ভোটারদের মধ্যে ব্যক্তিকেই মূল বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
ভিপি পদে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থী ও শিবিরপন্থী সাবেক নেতা সাদিক কাইয়ুম, ছাত্রদলের আবিদুল ইসলাম খান, স্বতন্ত্র প্রার্থী উমামা ফাতেমা, বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদের আবদুল কাদের, এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী শামিম হোসেন।
-
সাদিক কাইয়ুম: জুলাই অভ্যুত্থানে দৃশ্যমান ভূমিকা ও ক্যাম্পাসে ধারাবাহিক কার্যক্রমের কারণে তিনি অনেকটাই এগিয়ে।
-
আবিদুল ইসলাম: চমৎকার বক্তৃতা, ছাত্রদলের সংগঠনিক শক্তি ও শিবিরবিরোধী ভোট তাকে শক্ত অবস্থানে রেখেছে।
-
উমামা ফাতেমা: মেয়েদের হলে জনপ্রিয়তা ও সক্রিয় আন্দোলনমুখী অবস্থান তাকে মেয়েদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
-
আবদুল কাদের: শুরুতে ভালো অবস্থানে থাকলেও সাম্প্রতিক বিতর্কিত মন্তব্য তার গ্রহণযোগ্যতায় আঘাত হেনেছে।
-
শামিম হোসেন: শিক্ষার্থীবান্ধব প্রচার ও স্বতন্ত্র অবস্থান তাঁকে আলোচনায় রেখেছে, তবে সংগঠনিক ভিত্তির অভাব তাকে চ্যালেঞ্জে ফেলছে।
-
জিএস পদে ছাত্রদলের শেখ তানভীর বারী হামিম, শিবিরের এস এম ফরহাদ, বাগছাসের আবু বাকের মজুমদার, এবং সাংবাদিক আল সাদী ভূঁইয়া আলোচনায় রয়েছেন।
-
তানভীর বারী মাঠপর্যায়ে জনপ্রিয়,
-
ফরহাদের সংগঠনগত ভিত্তি মজবুত হলেও বিতর্ক তাকে ব্যাকফুটে ফেলছে,
-
বাকের আন্দোলনমুখী মুখ হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন,
-
আর সাদী শিবির-ছাত্রদলবিরোধী ভোটকে কেন্দ্র করে এগিয়ে থাকার চেষ্টা করছেন।
-
-
এজিএস পদে মহিউদ্দিন খান, তানভীর আল হাদী মায়েদ, তাহমিদ আল মুদ্দাসসির ও মহিউদ্দিন রনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন।
-
শিক্ষার্থীবান্ধব ভাবমূর্তি ও জুলাই আন্দোলনে ভূমিকার কারণে মহিউদ্দিন খান ভালো অবস্থানে আছেন।
-
মায়েদের ক্যাম্পাসে পরিচিতি থাকলেও বিতর্ক তাকে কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছে।
-
তাহমিদ ডিবেটিং ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে বুদ্ধিবৃত্তিক ভোট পেতে পারেন।
-
একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় সব প্যানেলের ইশতেহার একঘেয়ে ও প্রায় একই ধরনের। ফলে ভোটাররা দল নয়, ব্যক্তি এবং অতীত কর্মকাণ্ড-কে মূল্যায়ন করছেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাব্বির হোসেন বলেন,
“লিডিং ও অরাজনৈতিক প্যানেলগুলোর ইশতেহার প্রায় একই। শিক্ষার্থীদের প্রাসঙ্গিক ও বাস্তবভিত্তিক সমস্যার সমাধান দিতে হলে ভিন্নধর্মী ও সাহসী অবস্থান নিতে হবে।”
চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার নাজিম সীমান্ত বলেন,
“সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। সাদিক, আবিদ এবং উমামা—তিনজনেই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন।”
ছাত্রদের বড় অংশ বলছেন, বিগত দেড় দশকে হলে ছাত্রলীগের একচেটিয়া প্রভাব, র্যাগিং, এবং মত প্রকাশে বাধা ছিল তীব্র।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ কেউ ডাকসুর মাধ্যমেই চান হল সংস্কৃতির সংস্কার, সত্যিকার প্রতিনিধিত্ব এবং প্রশাসনের জবাবদিহিতা।
নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা প্রায় ৩৮ হাজার।
কেন্দ্রীয় সংসদের ২৮টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৫৮৬ জন, আর হল সংসদে মনোনয়ন নিয়েছেন ১,২২৬ জন।
নির্বাচন কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান,
“নির্বাচনী প্রস্তুতি প্রায় শেষ। ভিপি, জিএস ও এজিএস পদের ফলাফল নির্ধারণে ব্যবধান খুবই কম হবে বলে আমরা আশাবাদী।”
বিশ্লেষকদের মতে, এবার প্রার্থীরা দলীয় রূপরেখার চেয়ে শিক্ষার্থীবান্ধব ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনায় মনোযোগ দিয়েছেন। তবে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা—নির্বাচনের মাধ্যমে ডাকসু আবার শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের বাস্তব প্ল্যাটফর্মে পরিণত হোক, ইতিহাসের মতোই গৌরবময় হোক।


