দেশে ৭০ সালের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে শীত

জাতীয়
দেশে ৭০ সালের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে শীত
নিউজ ডেস্ক
২১ নভেম্বর ২০২৫

গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে ব্যর্থ হলে আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশের জলবায়ু আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে—ঢাকায় প্রকাশিত এক নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে এমন আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে। ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জলবায়ুর রিপোর্ট-২০২৫’ শীর্ষক এই গবেষণা অনুযায়ী ২০৪১–২০৭০ সময়কালে দেশের গড় তাপমাত্রা বাড়তে পারে আরও ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর শতাব্দীর শেষে এই বৃদ্ধি পৌঁছাতে পারে দেড় থেকে সাড়ে ৪ ডিগ্রি পর্যন্ত।

বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও নরওয়েজিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট যৌথভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। ভবিষ্যৎ জলবায়ুর পাঁচটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি ধরে দীর্ঘ সাত থেকে আট দশকের পরিবর্তনের একটি বিস্তারিত চিত্র এতে উঠে এসেছে। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী দশকগুলোতে গ্রীষ্মকাল আরও অস্থির হয়ে উঠবে। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত সময়ে সবচেয়ে বেশি তাপপ্রবাহ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা পশ্চিমাঞ্চলে ২০৭০ সালের মধ্যে পূর্বের তুলনায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। বর্ষার সময়ও তাপপ্রবাহের হার তিন গুণ বাড়তে পারে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

ঢাকার জন্য পরিস্থিতি আরও সংকটজনক উল্লেখ করে বলা হয়, রাজধানীবাসীকে প্রতিবছর কমপক্ষে দুটি তীব্র তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হতে হতে পারে—একটি বর্ষার আগে, আরেকটি বর্ষা–পরবর্তী মৌসুমে। দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা সাড়ে ৪ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে সবচেয়ে খারাপ সম্ভাবনা ধরে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

শীতের প্রভাব ধীরে ধীরে কমে আসবে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। শতাব্দীর শেষে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে কেবল উত্তর-পূর্বের কয়েকটি জেলায় এক–দু’দিন সামান্য শৈত্যপ্রবাহ টিকে থাকতে পারে। দক্ষিণ উপকূলে শীত পুরোপুরিই বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২০৭০ সালের মধ্যে বর্ষায় বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে ১১৮ মিলিমিটার এবং ২১০০ সালের দিকে তা বাড়তে পারে প্রায় ২৫৫ মিলিমিটার। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকায় সেই অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়বে উল্লেখযোগ্যভাবে।

গবেষকরা সতর্ক করেছেন, বিশ্বব্যাপী যেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠ গড়ে বছরে ২.১ মিলিমিটার বাড়তে পারে, সেখানে বাংলাদেশের উপকূলে তা ৫.৮ মিলিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। শতাব্দীর শেষে দেশের উপকূলীয় প্রায় ১৮ শতাংশ এলাকা স্থায়ীভাবে পানির নিচে চলে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। চরম পরিস্থিতিতে সুন্দরবনের ২৩ শতাংশ পর্যন্ত এলাকা পানিবন্দি হয়ে পড়তে পারে। ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ মানুষ স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে বলেও উল্লেখ করা হয়।

তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন কৃষি উৎপাদনে বড় আঘাত আনতে পারে। ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়া, গবাদিপশুর রোগবালাই বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততার কারণে মিঠাপানি ও মাছের আবাস সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকির ক্ষেত্রেও উদ্বেগ বাড়ছে। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, কলেরা ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের বিস্তার বাড়তে পারে। উচ্চ তাপমাত্রায় বাইরে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়বে, যা শ্রমজীবী মানুষের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেবে।

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন হঠাৎ থেমে যাবে না। তাই আমাদের প্রস্তুতিও হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি।” তিনি নিঃসরণ কমানো, উপকূলীয় সুরক্ষা অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন বাঁধ নির্মাণ, আশ্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি এবং আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হ্যাকন অ্যারাল্ড গুলব্র্যান্ডসেন বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশের সংকট নয়; এটি কৃষি, নগরায়ণ, জ্বালানি থেকে শুরু করে জনস্বাস্থ্যের প্রতিটি খাতে প্রভাব ফেলছে। তাই এর মোকাবিলায় বহুমুখী উদ্যোগ জরুরি।”

২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও নরওয়েজিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে কাজ করছে। এবার প্রকাশিত প্রতিবেদনটি তাদের তৃতীয় পূর্ণাঙ্গ গবেষণা।