সরকারের প্রতি সন্তুষ্টি ৫৪ শতাংশ আর প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ৬৬ শতাংশ
সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১৮০ দিন পূর্তিতে পরিচালিত এক জনমত জরিপে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ প্রধানমন্ত্রীর কাজে সন্তুষ্ট হলেও সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্টির হার ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
স্বাধীন জনমত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডপলার রিসার্চ বাংলাদেশ লিমিটেড পরিচালিত ‘অ্যাপ্রুভাল রেটিং সার্ভে ২০২৬’-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে। বুধবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইনোভিশন কনসালটিংয়ের অর্থায়ন ও সহায়তায় জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়।
জরিপে প্রধানমন্ত্রীর কাজে অসন্তোষ জানিয়েছেন ২১ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা। আর ১২ দশমিক ১ শতাংশ কোনো মতামত দেননি কিংবা উত্তর দিতে চাননি।
প্রতিবেদনে বর্তমান জনমতকে ‘সতর্ক আশাবাদ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে ডপলার রিসার্চ। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের প্রতি মানুষের ইতিবাচক মনোভাব থাকলেও দেশের সামগ্রিক গতিপথ এবং দৈনন্দিন জীবনের উন্নতি নিয়ে এখনো মতভেদ রয়েছে।
বিভিন্ন শ্রেণিতে প্রধানমন্ত্রীর গ্রহণযোগ্যতা
বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষা ও আয়ভেদে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সন্তুষ্টির হার ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। দেশের আট বিভাগেই প্রধানমন্ত্রীর কাজের প্রতি সন্তুষ্টির হার ৬২ দশমিক ৩ শতাংশের বেশি বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।
দলীয় সমর্থনের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর গ্রহণযোগ্যতার ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ, জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং আওয়ামী লীগের ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ সমর্থক প্রধানমন্ত্রীর কাজে সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন।
সরকারের কাজে সন্তুষ্টি কম
প্রধানমন্ত্রীর তুলনায় সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন কিছুটা কম। জরিপে ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ সরকারের কাজকে ভালো বলেছেন। বিপরীতে ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ তা খারাপ বলে মনে করেন।
দেশ সঠিক পথে এগোচ্ছে বলে মনে করেন ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা। অন্যদিকে ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশের ধারণা, দেশ ভুল পথে যাচ্ছে। এ বিষয়ে ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ কোনো মতামত দেননি।
দলীয় সমর্থকদের মধ্যেও এ প্রশ্নে পার্থক্য রয়েছে। বিএনপির সমর্থকদের ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ মনে করেন দেশ সঠিক পথে যাচ্ছে। জামায়াতের সমর্থকদের মধ্যে এ হার ৪৪ শতাংশ এবং এনসিপির সমর্থকদের মধ্যে ৫৫ দশমিক ২ শতাংশ। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ক্ষেত্রে হার ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও মূল্যস্ফীতিই বড় উদ্বেগ
জরিপে মানুষের প্রধান উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। নিত্যপণ্যের দামকে বড় সমস্যা বলেছেন ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ।
এরপর গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও কর্মসংস্থানের বিষয় উঠে এসেছে।
সরকারের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নেও এসব খাতে অসন্তোষের চিত্র স্পষ্ট। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ, জ্বালানি ও গ্যাসে ৭৯ দশমিক ৬ শতাংশ এবং নিত্যপণ্যের দামের ক্ষেত্রে ৬৯ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা সরকারের কাজকে খারাপ বলেছেন।
অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ, ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা
পরিবারের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ বলেছেন, এক বছর আগের তুলনায় তাদের পরিবারের অবস্থা খারাপ হয়েছে।
তবে আগামী এক বছর নিয়ে পুরোপুরি হতাশ নন তারা। আগামী ১২ মাসে পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো হবে বলে আশা করছেন ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা।
এ ছাড়া ফ্যামিলি কার্ডের প্রতি ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ, করনীতির প্রতি ৭০ দশমিক ৭ শতাংশ এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রতি ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা সমর্থন জানিয়েছেন।
বিরোধী নেতাদের নিয়েও জরিপ
বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে জরিপে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের কর্মকাণ্ডকে ভালো বলেছেন ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ উত্তরদাতা। অন্যদিকে এনসিপির প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়কের কর্মকাণ্ডকে ভালো বলেছেন ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ।
ডপলার রিসার্চ জানিয়েছে, বিএনপি সরকারের ১৮০ দিন পূর্তিকে কেন্দ্র করে এ জনমত জরিপ পরিচালনা করা হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার গঠিত হয়।
জরিপের নমুনা সংগ্রহে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের একটি জরিপে অংশ নেওয়া ১০ হাজার ৪১৩ জনের সঙ্গে সম্প্রতি টেলিফোনে যোগাযোগ করা হয়। তাদের মধ্যে ৩ হাজার ৪৪৩ জন এবারের জরিপে অংশ নেন।
ডপলারের তথ্য অনুযায়ী, জরিপের নমুনায় দেশের ৬৪টি জেলার ৪৮৯টি ওয়ার্ড ও গ্রামের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। ফলে সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমতের সামগ্রিক চিত্রে যেমন প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তুলনামূলক উচ্চ সন্তুষ্টি দেখা গেছে, তেমনি দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগও স্পষ্ট হয়েছে।


