ভয়াবহ জ্বালানি সংকট
২৮ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছয়টি বন্ধ, সাতটি বন্ধ হওয়ার পথে
জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় তীব্র ভোগান্তিতে পড়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রাম। অঞ্চলের ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ছয়টি ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। আরও কয়েকটি কেন্দ্র আংশিক উৎপাদনে রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার পাশাপাশি নগর ও গ্রামাঞ্চলে বেড়েছে লোডশেডিং।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) মঙ্গলবারের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ছয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে সম্পূর্ণ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে কয়েকটি কেন্দ্রে সক্ষমতার তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সামনে আরও কয়েকটি কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বন্ধ থাকা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে হাটহাজারী বিদ্যুৎকেন্দ্র, কাপ্তাই সোলার, রাউজান-১ ও রাউজান-২, টেকনাফ সোলার এবং ইউনাইটেড পাওয়ার। এসব কেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এদিকে আনলিমা এনার্জি, আনোয়ারা ইউনাইটেড, বারাকা, বারাকা কর্ণফুলী, জুলদা-১, জুলদা-২ ও জুডিয়াকসহ কয়েকটি কেন্দ্রেও উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে এসেছে। জ্বালানি সংকটের কারণে কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না।
তবে পিডিবির হিসাব বলছে, চট্টগ্রামে বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহে ঘাটতি নেই। পিক আওয়ারে প্রায় ১ হাজার ৬৯ মেগাওয়াট এবং অফ-পিক সময়ে প্রায় ৯৫৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। ফলে কাগজে-কলমে লোডশেডিং শূন্য দেখানো হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে অভিযোগ গ্রাহকদের।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ উঠেছে। পাথরঘাটা, আসকারদিঘির পাড়, হালিশহর, কালুরঘাট, বায়েজিদ বোস্তামীসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে দুর্ভোগ বেড়েছে। কোথাও কোথাও এক ঘণ্টাও টানা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ না থাকায় ওয়াসার পানি সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে, ফলে বাসাবাড়িতে বাড়ছে ভোগান্তি।
গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিতিও স্বস্তিদায়ক নয়। বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় গরমের মধ্যে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানাতেও। বায়েজিদ বোস্তামীসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় উৎপাদন কমেছে। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। জেনারেটর চালিয়েও পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়।
অন্যদিকে গ্যাস সংকটে গত কয়েক মাস ধরে বন্ধ রয়েছে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) উৎপাদন। সর্বশেষ গত ৩ মার্চ কারখানাটিতে উৎপাদন চললেও পরদিন থেকে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। কারখানাটি চালু রাখতে দৈনিক প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ মিলছে না।
উৎপাদন বন্ধ থাকায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি সিইউএফএলের এক হাজারের বেশি শ্রমিক-কর্মচারীর জীবন-জীবিকা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে চলতি আগস্টের শেষ দিকে কারখানাটিতে গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সিইউএফএলের উপব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সমীরন মারমা জানান, গ্যাস সংকটের কারণে ৪ মার্চ থেকে সার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় কারখানা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। চলতি মাসের শেষের দিকে গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার কথা রয়েছে।
সব মিলিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ, শিল্পকারখানায় উৎপাদন এবং সাধারণ গ্রাহকের বিদ্যুৎপ্রাপ্তি—তিন ক্ষেত্রেই সংকটের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বৃহত্তর চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদন—উভয় ক্ষেত্রেই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


