ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস করে সরকার পতনের হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের
ইরানের বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে দেশটির অর্থনীতির ওপর নজিরবিহীন চাপ তৈরির হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ইরানের অর্থনীতি এমনভাবে চাপে ফেলা হবে, যাতে দেশটির সরকারের পতন ঘটে এবং বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রয়োজন কমে আসে।
মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, ইরানকে ঘিরে ওয়াশিংটনের নতুন অর্থনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নে মিত্র ও অন্যান্য দেশগুলোকেও অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। তার ভাষায়, ‘আপনি হয় আমাদের সঙ্গে আছেন, নয়তো আমাদের বিরুদ্ধে।’
ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বা আর্থিক লেনদেন অব্যাহত রাখলে সংশ্লিষ্ট দেশ, ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, ইরানের তেল কেনা কিংবা দেশটিতে অর্থ পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত পক্ষগুলোর বিরুদ্ধে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করবে।
বেসেন্টের বক্তব্য এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারির পর। ট্রাম্প এর আগে ইরান সরকারকে সহায়তা করা দেশগুলোর জন্য ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতির’ সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী জানান, নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে তা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সমন্বিত অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কর্মসূচিতে পরিণত হতে পারে। তবে ঠিক কী ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি। আগামী ২৪ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরার কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগের পেছনে অন্যতম লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। তাদের দাবি ছিল, তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন থেকে বিরত রাখা। তবে ইরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
সামরিক সংঘাতের সময় ইরান ইসরায়েল, মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায়। একই সময়ে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি এই নৌপথ দিয়ে পরিবহন হওয়ায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে।
সংঘাত থামিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করতে চলতি বছরের এপ্রিল ও জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পৃথক যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে দুই দফা সমঝোতাই টেকসই হয়নি। আলোচনাও কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সামরিক অভিযানের বদলে এবার অর্থনৈতিক চাপকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পথে এগোচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।
দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা ইরানের অর্থনীতি এমনিতেই চাপের মুখে। চলতি বছরের শুরুতে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি হিসাবে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম গড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে এবং খাদ্যপণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
তবে নতুন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের সরকারকে দ্রুত পতনের দিকে ঠেলে দেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ইরানে দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকলেও এর আগে সেগুলো দেশটির সরকার পতন ঘটাতে পারেনি। বরং তেহরান বিকল্প বাণিজ্যপথ ও অর্থনৈতিক অংশীদার তৈরির মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলার চেষ্টা করেছে।
ইরানের খুজেস্তান প্রদেশের এক বাসিন্দা বিবিসিকে বলেন, নতুন অর্থনৈতিক চাপের প্রাথমিক প্রভাব পড়লেও দীর্ঘমেয়াদে ইরান তা সামলে নিতে সক্ষম হতে পারে। তার মতে, কয়েক দশক ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা দেশটির মানুষ এ ধরনের পরিস্থিতির সঙ্গে অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
আরেক ইরানি নাগরিকও মনে করেন, নতুন নিষেধাজ্ঞা অর্থনীতিতে চাপ বাড়ালেও তা সরকারের স্থায়িত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে না। তার মতে, ইরান দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বিকল্প পথে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও কঠোর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তেহরানের ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব এবং সেই চাপ আদৌ ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে পারবে কি না।


