হিন্দুস্তান টাইমসকে যা জানালেন হাসিনা
ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশে ফেরা নিয়ে ভারত বা বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে কোনো গোপন সমঝোতা হয়নি বলেও দাবি করেছেন তিনি।
ভারতের সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। অজ্ঞাত স্থান থেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত একান্তই তার নিজের। রাজনৈতিক সংকট অনির্দিষ্টকাল চলতে দেওয়া যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট তারিখ, সময় ও কোন পথে প্রবেশ করবেন, তা যথাসময়ে জানাবেন বলে জানান।
তিনি দাবি করেন, তার সরকারের সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মাথাপিছু আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। বর্তমানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমেছে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে সংকট তৈরি হয়েছে এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের সমস্যাও আবার দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, দলের অনেক নেতা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন, আবার অনেকে দেশে থেকেও আত্মগোপনে রয়েছেন। নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে কে কখন দেশে ফিরবেন, সে বিষয়ে দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নিজের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোকে ‘বানোয়াট’ দাবি করে শেখ হাসিনা বলেন, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও হত্যার হুমকি তার জন্য নতুন নয়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। ক্ষমতায় ফেরার জন্য নয়, জনগণের পাশে দাঁড়াতেই দেশে ফিরতে চান বলে দাবি করেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের সমালোচনা
আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেন শেখ হাসিনা। তার দাবি, কোনো রাজনৈতিক দল ভালো না খারাপ—সেটি নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণেরই নির্ধারণ করার সুযোগ থাকা উচিত।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যারা বিভিন্ন অভিযোগ তুলছেন, তাদের উচিত নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায় নেওয়া। দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও হয়রানির অভিযোগও করেন তিনি।
শেখ হাসিনার দাবি, নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে টিকে থাকবে এবং দলটির জনসমর্থন রয়েছে।
প্রত্যর্পণ নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা তা সরাসরি নাকচ করেন। তিনি বলেন, যারা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে এবং দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে, তাদের সঙ্গে কোনো গোপন রাজনৈতিক সমঝোতার প্রশ্নই আসে না।
বাংলাদেশের বর্তমান সরকার তার প্রত্যর্পণের জন্য চাপ দিচ্ছে—এমন প্রসঙ্গে তিনি বিএনপি বা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে প্রশ্নটি করার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ছিল সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়।
তিস্তা ও চীনের সঙ্গে সহযোগিতা প্রসঙ্গ
তিস্তা নদী উন্নয়ন প্রকল্প এবং চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়েও কথা বলেন শেখ হাসিনা।
তিনি দাবি করেন, তার সরকারের সময় দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছিল এবং দেশের সব এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সময়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দেশে কয়েকটি সার কারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ থাকার দাবি করে শেখ হাসিনা বলেন, এমন পরিস্থিতিতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
বাংলাদেশের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ‘বাংলাদেশ আরেকটি পাকিস্তানে পরিণত হতে পারে’—এমন মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে কোনো দেশের সাধারণ মানুষকে বোঝানো হয়নি; বরং উগ্রবাদ, সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও দুর্বল প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড বাড়ছে দাবি করে তিনি বিভিন্ন বিস্ফোরক উদ্ধার ও জঙ্গি নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলেন। একই সঙ্গে মাজার, সাংস্কৃতিক স্থাপনা ও ধর্মনিরপেক্ষ প্রতীকে হামলার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তার দাবি, বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী সক্ষমতা দুর্বল হলে এর প্রভাব শুধু দেশের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ থাকবে না; প্রতিবেশী দেশসহ পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তায় এর প্রভাব পড়তে পারে।
‘নিজের দেশেই ফিরব’
ভারতে অবস্থান সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি সেখানে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে আছেন এবং ভারত সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞ। তবে বাংলাদেশের মানুষ, দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বিষয়ে তিনি নিয়মিত খোঁজ রাখেন বলে জানান।
তিনি বলেন, দেশে ফিরতে তার কারও অনুমতির প্রয়োজন নেই এবং তিনি নিজের দেশেই ফিরতে চান। প্রত্যর্পণকে শর্ত হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, গণতন্ত্র দুর্বল হলে, উগ্রপন্থার উত্থান ঘটলে, সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হলে দুই দেশের সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি শেখ হাসিনা জানান, আওয়ামী লীগের অন্য নেতাকর্মীদের দেশে ফেরার বিষয়টি নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও দলীয় আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে।


