বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ-সংঘাত, এআইয়ের ঝুঁকি; জাতিসংঘে বসছেন বিশ্বনেতারা
বিশ্বজুড়ে একের পর এক সংঘাত, দ্রুত বিকাশমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন—এমন এক প্রেক্ষাপটে নিউইয়র্কে জড়ো হচ্ছেন বিশ্বের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক শুরু হচ্ছে। ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে এ পর্ব। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এতে প্রায় ১৩০ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান সরাসরি অংশ নেবেন। এবারের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য—‘আস্থা পুনর্গঠন, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ’।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা যখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে, তখনই শুরু হচ্ছে এবারের অধিবেশন। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধ, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং এআইয়ের শাসনব্যবস্থা—সবই উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।
এবারও সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিউইয়র্ক সফরে তিনি একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও অংশ নেবেন। ইরান যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ তার আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে থাকবে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
অন্যদিকে, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ না নিয়ে ২৩ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফর করবেন। ওয়াশিংটনে ২৪ সেপ্টেম্বর ট্রাম্পের সঙ্গে তার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্য, এআই, তাইওয়ান এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
ফলে সাধারণ পরিষদের বাইরে ট্রাম্প-সি বৈঠকও এবারের আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে উঠছে।
এবারের অধিবেশনে জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হবে। যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘে তার অর্থায়ন কমিয়েছে এবং একাধিক জাতিসংঘ সংস্থা থেকে সরে যাওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের সক্ষমতা এবং সংস্থাটির সঙ্গে ওয়াশিংটনের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্যেও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
এবারের সাধারণ পরিষদে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ এবং এর সম্ভাব্য ঝুঁকিও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এআইয়ের উন্নয়ন ও ব্যবহারে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর শাসনব্যবস্থা এবং সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছেন।
এআইয়ের বিষয়টি সাধারণ পরিষদের আলোচনার বাইরেও গুরুত্ব পাচ্ছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানও আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের মহাসচিব ডোরিন বগদান-মার্টিনের সঙ্গে বৈঠকে উন্নত এআইয়ের চ্যালেঞ্জ এবং এআই শাসনব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদেও এআই ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যানকে ব্রিফ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বৈঠকে এআইয়ের দ্রুত বিকাশ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং অভিন্ন নিরাপত্তা মানদণ্ডের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হবে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
এবারের অধিবেশনে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধও বড় জায়গা দখল করবে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত এবং এর প্রভাব নিয়ে বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ইতোমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চল ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে। ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রেও খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৃষ্ণসাগরীয় বাণিজ্যের ওপর এর প্রভাব আলোচনায় আসতে পারে।
জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে শান্তি ও নিরাপত্তার পাশাপাশি জলবায়ু, স্বাস্থ্য, টেকসই উন্নয়ন এবং এআই শাসন নিয়েও একাধিক বৈঠক রয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর জলবায়ু ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং ২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অস্তিত্বগত হুমকি নিয়ে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
এবারের অধিবেশন এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন বিশ্ব একদিকে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে রয়েছে, অন্যদিকে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির প্রচলিত কাঠামোকে নতুন প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জাতিসংঘের অর্থসংকট এবং সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক। ফলে এবারের সাধারণ পরিষদ শুধু চলমান যুদ্ধ ও সংকট নিয়ে আলোচনা করার জায়গা নয়; আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, জাতিসংঘ কীভাবে পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে মানিয়ে নেবে এবং এআইয়ের মতো নতুন প্রযুক্তির ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশগুলো কতটা সমন্বিত হতে পারবে—এসব প্রশ্নও আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।
এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বর্তমান মেয়াদ ২০২৬ সালের শেষ দিকে শেষ হওয়ার কথা। ফলে এবারের অধিবেশনের সময় জাতিসংঘের পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়েও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়বে।


