জাতিসংঘে ট্রাম্পের বক্তব্যে একের পর এক বিতর্কিত দাবি, বলছে এপি
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বিশ্বনেতাদের সামনে দেওয়া ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনের সামরিক, অর্থনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতির সাফল্যের নানা দিক তুলে ধরেছেন। তবে অস্ত্রের মজুত, ভেনেজুয়েলার তেল, মাদক দমন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং যুদ্ধ বন্ধের মতো একাধিক বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব তথ্যের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।
এপি’র ফ্যাক্টচেকে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের এসব দাবির বেশ কয়েকটি এর আগেও তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে করা বক্তব্যে উঠে এসেছে। বিভিন্ন সরকারি তথ্য, সামরিক কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণের সঙ্গে তুলনা করলে এসব দাবির কিছু অতিরঞ্জিত, কিছু বিভ্রান্তিকর এবং কিছু সরাসরি তথ্যের সঙ্গে মেলে না।
জাতিসংঘে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রয়োজনের তুলনায় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র রয়েছে এবং ইতিহাসে নজিরবিহীন গতিতে নতুন অস্ত্র তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এপি জানিয়েছে, প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের তথ্য এই দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধসহ বিভিন্ন সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর অস্ত্রের মজুত কমেছে। বিশেষ করে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক পুনরায় পর্যাপ্ত মাত্রায় মজুত করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে বলে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ইউরোপে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়ে মার্কিন ও ন্যাটো কর্মকর্তারাও উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক তেল চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মজুত একত্র করলে বিশ্বের ৬০ শতাংশের বেশি তেল তাদের হাতে রয়েছে।
এপি’র হিসাবে, ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেল মজুত ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি। চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত মজুতের ওপর ১০০ বছরের অধিকার পেয়েছে বলে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মজুতের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার মজুত যোগ করলেও বিশ্বের প্রায় ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত মজুতের মাত্র প্রায় ২২ শতাংশ হয়।
এ ছাড়া ভেনেজুয়েলার জ্বালানি অবকাঠামো দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত থাকায় নতুন বিনিয়োগের পরও উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হবে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সমুদ্রপথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আগে ৯৭ শতাংশ মাদক ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেন ট্রাম্প। তবে এ দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো সামগ্রিক পরিসংখ্যান নেই বলে জানিয়েছে এপি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক পাচারের মোট পরিমাণ নির্ভুলভাবে জানা সম্ভব নয়। ফলে কত শতাংশ মাদক আটকানো হয়েছে, সেই হিসাবও নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। মাদক জব্দের পরিসংখ্যান মূলত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আটক কার্যক্রমের পরিমাণ দেখায়; মোট কত মাদক পাচার হয়েছে, তা নয়।
ট্রাম্প দাবি করেন, দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে ১০ লাখের বেশি বেসরকারি খাতের চাকরি সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এপি’র হিসাব অনুযায়ী, এ সময়ে নতুন চাকরির সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৭ হাজার। এপি আরও জানিয়েছে, ঐতিহাসিক প্রবণতার তুলনায় এই বৃদ্ধি অস্বাভাবিকভাবে বড় নয়।
একইভাবে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পাওয়ার দাবি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা অঙ্ক ১১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। সেই হিসাবেও আগের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে করা কিছু বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে এপি জানিয়েছে।
জাতিসংঘের ভাষণে ট্রাম্প বলেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি হলো আটটি যুদ্ধের অবসান ঘটানো। তবে তাঁর তালিকায় থাকা কয়েকটি সংঘাতকে যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে।
এপি’র ফ্যাক্টচেকে বলা হয়েছে, ট্রাম্প যেসব সংঘাতের অবসানের কৃতিত্ব নিয়েছেন, তার অন্তত দুটি ক্ষেত্রে তাঁর মেয়াদে কোনো যুদ্ধ চলছিল না। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চলমান যুদ্ধের সূচনার সঙ্গেও ট্রাম্প প্রশাসনের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে ‘আটটি যুদ্ধ বন্ধ’ করার দাবিটি সরলভাবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই।
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প মূলত তাঁর প্রশাসনের সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং পররাষ্ট্রনীতির অর্জন তুলে ধরেন। তবে এপি ও অন্যান্য ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্যের বেশ কয়েকটি পরিসংখ্যান ও দাবি নিয়ে তথ্যগত অসঙ্গতি বা অতিরঞ্জনের বিষয় উঠে এসেছে।


