জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে তলিয়ে যেতে পারে দেশের ৪ শতাংশ ভূমি

জাতীয়
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে তলিয়ে যেতে পারে দেশের ৪ শতাংশ ভূমি
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২৫ সেন্টিমিটার বাড়লে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ৪ শতাংশ ভূমি পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এতে প্রায় এক কোটি মানুষের ঘরবাড়ি, জীবন-জীবিকা ও মানবিক মর্যাদা হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুম-৪-এ ‘হাই-লেভেল মিটিং টু অ্যাড্রেস দ্য এক্সিস্টেনশিয়াল থ্রেটস পোসড বাই সি-লেভেল রাইজ’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের অংশ হিসেবে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২৫ সেন্টিমিটার বাড়লে বাংলাদেশের প্রায় ৪ শতাংশ ভূমি তলিয়ে যেতে পারে। এতে প্রায় এক কোটি মানুষের ঘরবাড়ি, জীবিকা ও মানবিক মর্যাদা হুমকির মুখে পড়বে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

বাংলাদেশকে একটি সক্রিয় বদ্বীপ হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, দেশের ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে শত শত নদী প্রবাহিত হয়ে সাগরে মিশেছে। দেশের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি পানির কাছাকাছি বসবাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে বাংলাদেশের সমৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ উপকূলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত।

সীমিত সম্পদ নিয়েও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো এবং উপকূল সুরক্ষায় বিনিয়োগের কথা তুলে ধরেন তিনি।

জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি পানি সংরক্ষণ ও মজুদের জন্য পদ্মা ব্যারাজ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া, মাস্টার প্ল্যানের মাধ্যমে তিস্তা ব্যারাজ আধুনিকায়ন এবং ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি বাংলাদেশ সবুজ প্রবৃদ্ধির দিকেও এগিয়ে যাচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া সবুজ শিল্প ও পরিবেশবান্ধব পরিবহনের প্রসার, জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলা এবং বন, জলাভূমি ও ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থা সুরক্ষায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

তবে শুধু অভিযোজনমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব পুরোপুরি মোকাবিলা করা সম্ভব নয় বলে সতর্ক করেন তিনি। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানোর ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো একা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ভয়াবহ পরিণতি মোকাবিলা করতে পারে না। আমাদের প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে বৈশ্বিক সহায়তা ও সহযোগিতা প্রয়োজন।’

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি চারটি জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

প্রথমত, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার লক্ষ্য অর্জনে দ্রুত, ব্যাপক ও ন্যায়সংগতভাবে কার্বন নিঃসরণ কমানোর আহ্বান জানান তিনি।

দ্বিতীয়ত, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন কার্যক্রমের জন্য পূর্বানুমেয় ও সহজলভ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করার কথা বলেন।

তৃতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তি, তথ্য-উপাত্ত ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

চতুর্থত, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন ও জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানান প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সমুদ্র দ্রুত উচ্চতর হচ্ছে। আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেও তার চেয়ে দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ এবং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় এখনই আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে।’

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অভিঘাতে কোনো দেশ যেন একা না পড়ে, সে জন্য ঘোষণাপত্রে দেওয়া অঙ্গীকারগুলোকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বৈশ্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।