চীনের প্রযুক্তি খাতের অগ্রগতি বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

চীনের প্রযুক্তি খাতের অগ্রগতি বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
১৯ অক্টোবর ২০২৬

চীনের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের সম্পর্ক গভীর। এই সম্পর্ক কেবল আমদানি-রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো উদীয়মান খাতেও দুই দেশের সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় চীনের বাজার, বিনিয়োগ ও শিল্প খাতের অগ্রগতিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

চীনের চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজার। এসব তথ্যের দিকে নজর রাখছে বাংলাদেশও। কারণ, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, আমদানি চাহিদা ও বিনিয়োগের গতিপথ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে।

প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে চীনের মোট পণ্য আমদানি-রপ্তানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৭৮ ট্রিলিয়ন ইউয়ান, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। টানা চার মাস ধরে দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্যে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

এ সময়ে চীনের রপ্তানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং আমদানি বেড়েছে ২২ শতাংশ। রপ্তানির তুলনায় আমদানির দ্রুত প্রবৃদ্ধি দেশটির বিদেশি পণ্যের চাহিদা বাড়ার ইঙ্গিত দিতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এটি চীনের বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার একটি সুযোগ।

দুই দেশের বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির চিত্র দেখা গেছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে ১২ শতাংশ, যা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি।

চীনের তৃতীয় প্রান্তিকের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসে অবশ্য কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ৪ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে, অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও চীনের প্রবৃদ্ধির এই সম্ভাবনা দেশটির বিনিয়োগ সক্ষমতা ও বিদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো খাতে চীনের অগ্রগতি বাংলাদেশের জন্য নতুন সহযোগিতার পথ খুলে দিতে পারে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের অর্থনীতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) চলতি অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। তবে একই সঙ্গে বাংলাদেশের ঋণঝুঁকির মাত্রা ‘নিম্ন’ থেকে ‘মধ্যম’ পর্যায়ে উন্নীত করেছে সংস্থাটি।

রপ্তানি খাতেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৮২ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ ট্রিলিয়ন টাকার বেশি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং শিল্প খাতের সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এ পরিস্থিতিতে নতুন সরকার স্থিতিশীলতা থেকে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। পরিকল্পনার একটি লক্ষ্য হলো, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি ৭৪২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা। এই লক্ষ্য অর্জনে অর্থায়ন ও বিনিয়োগের নতুন উৎস খুঁজে বের করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

চলতি বছরের জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় দুই দেশ একাধিক সহযোগিতার নথিতে সই করে। চীন বাংলাদেশ থেকে আরও মানসম্পন্ন পণ্য আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করে। পাশাপাশি বাংলাদেশে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগে সমর্থন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহের কথাও জানায়।

এসব খাত বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ডিজিটাল অর্থনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উৎপাদন, সেবা, ব্যবসা পরিচালনা ও কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ শিল্পের জ্বালানি চাহিদা পূরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে সহায়ক হতে পারে। চীনের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হলে বাংলাদেশের শিল্পায়নেও গতি আসতে পারে।

অবকাঠামো ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং চট্টগ্রাম চীন অর্থনৈতিক শিল্পপার্কের কাজ সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে চট্টগ্রাম চীন অর্থনৈতিক শিল্পপার্কের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। বাংলাদেশের কর্মকর্তারা প্রকল্পটিকে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও শিল্পায়ন এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।

শিল্পপার্কটির সম্ভাব্য গুরুত্ব শুধু নতুন কারখানা স্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ও যুক্ত। তবে এসব সুফল বাস্তবে পেতে হলে বিনিয়োগ বাস্তবায়ন, অবকাঠামোগত প্রস্তুতি, দক্ষ জনশক্তি এবং কার্যকর নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশি অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদও বিনিয়োগের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, গত দুই বছরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগ কমেছে। নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিনিয়োগকে আবার জাতীয় অর্থনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা। তিনি আরও বলেছেন, চীন ও চীনা বিনিয়োগের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে জোরালো সমর্থন রয়েছে।

চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দেশটির বিদেশে বিনিয়োগের প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য তাই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। চীন যদি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারে এবং আমদানি চাহিদা বাড়তে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও কৃষিপণ্যের জন্য দেশটির বিশাল বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে পণ্যের মান, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, বাজার সম্পর্কে জ্ঞান এবং বাণিজ্যিক বাধা মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

একইভাবে, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করলে চট্টগ্রাম চীন অর্থনৈতিক শিল্পপার্কের মতো প্রকল্পে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সহযোগিতার আগ্রহ বাস্তব প্রকল্পে রূপ নিলে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও উৎপাদন খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এই সহযোগিতাকে একতরফা সহায়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি দুই দেশের পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থের বিষয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন বিনিয়োগ, রপ্তানি বাজার, প্রযুক্তি ও শিল্পায়নের সুযোগ। অন্যদিকে, চীনের প্রয়োজন নতুন বাজার, বৈচিত্র্যময় সরবরাহব্যবস্থা এবং নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক অংশীদার। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুই পক্ষই এ সম্পর্ক থেকে লাভবান হতে পারে।

প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের চীনা অর্থনীতি আবাসন খাতের সমন্বয়, বৈদেশিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটির অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এর অভিযোজনক্ষমতা, উৎপাদনভিত্তি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের গতিপথ বিশ্লেষণ করাও প্রয়োজন। প্রবৃদ্ধি ও বাণিজ্যের পরিসংখ্যান সেই বৃহত্তর চিত্রের একটি অংশ তুলে ধরে।

বাংলাদেশের জন্য চীন শুধু একটি বড় বাণিজ্য অংশীদার নয়; দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান আমদানি উৎস এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ উৎসও। ফলে চীনের অর্থনীতিতে পরিবর্তন ঘটলে তার প্রভাব বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়, রপ্তানির সুযোগ, শিল্পায়ন এবং বিনিয়োগের পরিবেশে পড়তে পারে।

চীনের তৃতীয় প্রান্তিকের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান প্রকাশের পর প্রবৃদ্ধি নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হবে। তবে বাংলাদেশের জন্য শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার পর্যবেক্ষণ করাই যথেষ্ট নয়। চীন কোন ধরনের পণ্য আমদানি করছে, কোন খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে, কী ধরনের শিল্প ও অবকাঠামো গড়ে তুলছে—এসব বিষয়ও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় দেশটির অগ্রগতি থেকে বাংলাদেশের জন্য কী সুযোগ তৈরি হতে পারে, তা চিহ্নিত করতে হবে।

কারণ, এসব প্রবণতার সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। চীনের অর্থনৈতিক গতিপথ সম্পর্কে সঠিক ধারণা নিয়ে পরিকল্পনা করতে পারলে বাংলাদেশ তার বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারবে।